ঢাকা ০২:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচন কলুষিত হওয়ার ২২ কারণ: তদন্ত প্রতিবেদনে রোমহর্ষক জালিয়াতির চিত্র

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও পদ্ধতিগত ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন।

বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন কলুষিত হওয়ার ২২টি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। সোমবার প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ভোট ডাকাতির কথা শুনলেও এত নির্লজ্জভাবে পুরো সিস্টেম দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের মতো করে রায় লিখে নেওয়ার বিষয়টি ছিল অভাবনীয়। সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছে যে, শুধু কারচুপিতেই শেষ হয়নি, বরং নির্বাচনের পর প্রমাণ মুছে ফেলতে সংশ্লিষ্ট বহু নথি ও তথ্য পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে তিনটি নির্বাচন কলুষিত হওয়ার যে ২২টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান হলো— তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলা ও গুম, জাল ভোট প্রদান এবং নির্বাচনের আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা। এছাড়া প্রশাসনের মাধ্যমে নির্বাচনি কারচুপি, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা, ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, সংসদীয় সীমানার অনিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রকাশ না করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। কমিশন জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে প্রকৃত ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে নিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং একটি বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করত।

তদন্তের সময় কমিশন ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত ২০ জনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তাকে জেরা করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকসহ গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কমিশন অনিয়মে জড়িত ২৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করার পাশাপাশি কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে এমন পরিকল্পিত ও সম্মিলিত কলঙ্কজনক অধ্যায় বিরল। প্রধান উপদেষ্টা এই পুরো রেকর্ড জাতির সামনে তুলে ধরা এবং নথিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

যাত্রাবাড়ীতে চলন্ত গাড়িতে ছিনতাই: দেশীয় অস্ত্রসহ দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার

নির্বাচন কলুষিত হওয়ার ২২ কারণ: তদন্ত প্রতিবেদনে রোমহর্ষক জালিয়াতির চিত্র

আপডেট সময় : ১২:২৬:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে নজিরবিহীন জালিয়াতি ও পদ্ধতিগত ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন।

বিগত তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন কলুষিত হওয়ার ২২টি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন। সোমবার প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টা গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ভোট ডাকাতির কথা শুনলেও এত নির্লজ্জভাবে পুরো সিস্টেম দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের মতো করে রায় লিখে নেওয়ার বিষয়টি ছিল অভাবনীয়। সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই কমিশন তদন্ত করতে গিয়ে দেখেছে যে, শুধু কারচুপিতেই শেষ হয়নি, বরং নির্বাচনের পর প্রমাণ মুছে ফেলতে সংশ্লিষ্ট বহু নথি ও তথ্য পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে তিনটি নির্বাচন কলুষিত হওয়ার যে ২২টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান হলো— তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে ব্যবহার, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলা ও গুম, জাল ভোট প্রদান এবং নির্বাচনের আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা। এছাড়া প্রশাসনের মাধ্যমে নির্বাচনি কারচুপি, ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা, ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো, সংসদীয় সীমানার অনিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তন এবং নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রকাশ না করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। কমিশন জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে প্রকৃত ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে নিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং একটি বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করত।

তদন্তের সময় কমিশন ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে চিহ্নিত ২০ জনের বেশি শীর্ষ কর্মকর্তাকে জেরা করেছে। এই তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শকসহ গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। কমিশন অনিয়মে জড়িত ২৩ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করার পাশাপাশি কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে নির্বাচন নিয়ে এমন পরিকল্পিত ও সম্মিলিত কলঙ্কজনক অধ্যায় বিরল। প্রধান উপদেষ্টা এই পুরো রেকর্ড জাতির সামনে তুলে ধরা এবং নথিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।