ঢাকা ০৭:৫৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

গ্যাস, মূল্যস্ফীতি ও চাঁদাবাজির চাপে ধুঁকছে রেস্তোরাঁ খাত: সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৪:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

গ্যাস সংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ট্রেড ইউনিয়নের নামে চাঁদাবাজিসহ গুরুতর কয়েকটি সমস্যায় জর্জরিত দেশের রেস্তোরাঁ খাত। এসব সংকট নিরসনে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ এবং খাত রক্ষায় সুপরিকল্পিত নীতি ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা এই দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি ওসমান গনি এবং মহাসচিব ইমরান হাসানসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এবং ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এই খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ না হয়ে বরং বিগত দিনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান অভিযোগ করেন, একটি অসাধু চক্র এলপিজি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তিনি জানান, অনেক রেস্তোরাঁ পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, আর যারা কিনছে, তাদের ১,৩০০ টাকার সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারাও নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতীকী জরিমানা বিপরীত ফল দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইমরান হাসান আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়, যদিও এই খাতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হতো। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এই সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে। অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যার ফলে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হলে গ্রাহক হারাচ্ছেন মালিকরা এবং লোকসান বেড়েই চলেছে।

পাশাপাশি, বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (যেমন তেল, ডাল, চাল, পেঁয়াজ) লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে, যা তাদের আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এছাড়াও, শ্রমিক সংগঠনের পরিচয়ধারী কতিপয় ব্যক্তি ও বহিরাগতরা হুমকি-ধামকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে। এসব দাবি পূরণ করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে। সমিতির নেতারা আশঙ্কা করছেন, একটি কর্পোরেট গোষ্ঠী ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবহার করে রেস্তোরাঁ খাত দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করে:
১. জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাস সংকট, অবিলম্বে নিরসন করতে হবে।
২. রেস্তোরাঁ ব্যবসা কর্পোরেট দখলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে।
৩. মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৪. ভোক্তা পর্যায়ে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বর্তমান ও আগামী সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা সুপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে।

সমিতির নেতারা বলেন, এই সেক্টরে কর্মরত ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ খাবারের জন্য রেস্তোরাঁর উপর নির্ভরশীল হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তাই রেস্তোরাঁ সেক্টরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান তারা। অন্যথায়, যদি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি না হয়, অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ না করা হয় এবং গ্যাস সংকটসহ সব সমস্যার সমাধান না হয়, তবে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা ব্যবসা বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আগামী দুই বছর কঠিন সময়: কঠোর সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রীর

গ্যাস, মূল্যস্ফীতি ও চাঁদাবাজির চাপে ধুঁকছে রেস্তোরাঁ খাত: সংকট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

আপডেট সময় : ০৬:৪৪:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

গ্যাস সংকট, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ট্রেড ইউনিয়নের নামে চাঁদাবাজিসহ গুরুতর কয়েকটি সমস্যায় জর্জরিত দেশের রেস্তোরাঁ খাত। এসব সংকট নিরসনে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ এবং খাত রক্ষায় সুপরিকল্পিত নীতি ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা এই দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি ওসমান গনি এবং মহাসচিব ইমরান হাসানসহ অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা এবং ৩০ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এই খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটময় সময় অতিক্রম করছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ না হয়ে বরং বিগত দিনের প্রতিবন্ধকতাগুলো দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে।

সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান অভিযোগ করেন, একটি অসাধু চক্র এলপিজি গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তিনি জানান, অনেক রেস্তোরাঁ পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না, আর যারা কিনছে, তাদের ১,৩০০ টাকার সিলিন্ডার ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টারাও নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতীকী জরিমানা বিপরীত ফল দিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইমরান হাসান আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে রেস্তোরাঁ খাতে পাইপলাইন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করা হয়, যদিও এই খাতে মাত্র ৫ শতাংশ গ্যাস ব্যবহৃত হতো। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে আমদানি করা এলপিজি গ্যাসের ব্যবসা বেসরকারি সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে এই সিন্ডিকেট পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে একচেটিয়া ব্যবসা চালাচ্ছে। অতিরিক্ত দামে এলপিজি কিনে রান্না করতে গিয়ে রেস্তোরাঁগুলোর পরিচালন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে, যার ফলে খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হলে গ্রাহক হারাচ্ছেন মালিকরা এবং লোকসান বেড়েই চলেছে।

পাশাপাশি, বর্তমান বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের (যেমন তেল, ডাল, চাল, পেঁয়াজ) লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এর সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে রেস্তোরাঁ খাতে, যা তাদের আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এছাড়াও, শ্রমিক সংগঠনের পরিচয়ধারী কতিপয় ব্যক্তি ও বহিরাগতরা হুমকি-ধামকি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায় করছে। এসব দাবি পূরণ করতে না পারলে অনেক ক্ষেত্রে মালিকদের ওপর শারীরিক হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে। সমিতির নেতারা আশঙ্কা করছেন, একটি কর্পোরেট গোষ্ঠী ট্রেড ইউনিয়নকে ব্যবহার করে রেস্তোরাঁ খাত দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করে:
১. জ্বালানি সংকট, বিশেষ করে গ্যাস সংকট, অবিলম্বে নিরসন করতে হবে।
২. রেস্তোরাঁ ব্যবসা কর্পোরেট দখলের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ট্রেড ইউনিয়নের নামে নৈরাজ্য বন্ধ করতে হবে।
৩. মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
৪. ভোক্তা পর্যায়ে রেস্তোরাঁর খাবারের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে বর্তমান ও আগামী সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রেস্তোরাঁ খাত রক্ষায় আলাদা সুপরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে।

সমিতির নেতারা বলেন, এই সেক্টরে কর্মরত ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে দেশের অন্তত ৩০ শতাংশ মানুষ খাবারের জন্য রেস্তোরাঁর উপর নির্ভরশীল হবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তাই রেস্তোরাঁ সেক্টরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানান তারা। অন্যথায়, যদি ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি না হয়, অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ না করা হয় এবং গ্যাস সংকটসহ সব সমস্যার সমাধান না হয়, তবে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীরা ব্যবসা বন্ধ করে রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।