বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। আশুলিয়ার একটি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানায় এআই-নির্ভর আধুনিক যন্ত্রপাতি ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যবহারের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা আগের তুলনায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কারখানার ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল কুদ্দুছ জানান, যেখানে আগে ঘণ্টায় ১০০ ইউনিট উৎপাদন হতো, এখন সেখানে ৪০০ ইউনিট উৎপাদন হচ্ছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেলাইয়ের ভুল ধরা, কাপড়ের দাগ শনাক্ত করা এবং নিখুঁত ডিজাইন নিশ্চিত করা এখন অনেক দ্রুত ও সহজ হয়েছে। অটোমেটিক কাটিং মেশিনের মাধ্যমে কাপড়ের অপচয় কমছে এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে। মালিকরা যেমন লাভবান হচ্ছেন, শ্রমিকরাও কম সময়ে বেশি কাজ করতে পারায় কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছেন। তবে এর ফলে ১০ জনের কাজ একজনে নেমে আসায় শ্রমিকদের চাকরি হারানোর একটি বড় আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তাসত্ত্বেও বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এআই ও অটোমেশনকে অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বের প্রায় ৬৫ শতাংশ কোম্পানি এখন নিয়মিত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী ৭৮ শতাংশ কোম্পানি তাদের অন্তত একটি ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই যুক্ত করেছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া জাতীয় এআই নীতিমালার মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এবং ভারত প্রতি বছর লাখের বেশি এআই প্রকৌশলী তৈরি করছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার বিপরীতে বাংলাদেশ এআই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনো বেশ পিছিয়ে আছে। ২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১২০টি কোম্পানির মধ্যে ৯৭ শতাংশই জানিয়েছে যে তারা দক্ষ এআই কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। ইউনেস্কোর ২০২৫ সালের সূচক বলছে, বাংলাদেশে এআই গবেষণা সক্ষমতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, সরকার জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলের আওতায় এআই গভর্ন্যান্স ও মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করছে, যাতে উৎপাদনমুখী খাতগুলোতে প্রায়োগিক এআই দক্ষতা গড়ে তোলা যায়।
কানাডার ডালহৌসি ইউনিভার্সিটির গবেষক শুভ্র পালের মতে, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সস্তা শ্রম ও সাধারণ কোডিং-নির্ভর ফ্রিল্যান্সিং মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা এখন এআই-এর কারণে হুমকির মুখে। এআই এখন এসব সাধারণ কাজ মানুষের চেয়ে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করতে সক্ষম। যদি দেশীয় জনশক্তিকে উচ্চমূল্যের এআই দক্ষতায় উন্নীত করা না যায়, তবে ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো এই বাজার দখল করে নেবে। গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের আগে দক্ষ এআই প্রকৌশলীর প্রাপ্যতা যাচাই করে। শুভ্র পালের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এখন ‘মানুষ বনাম এআই’ নয়, বরং ‘এআই-জানা দেশ বনাম এআই না জানা দেশের’ মধ্যে। বাংলাদেশ যদি এখনো ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় পড়ে থাকে, তবে গ্লোবাল মার্কেটে দামে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
তবে কৃষিখাতে এআই ব্যবহারের একটি সফল উদাহরণ তৈরি করেছে ‘ডা. চাষী’ অ্যাপ। ৮৭ হাজার নিবন্ধিত ব্যবহারকারী এই অ্যাপের মাধ্যমে ফসলের রোগ নির্ণয়, সঠিক সারের পরিমাণ এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাচ্ছেন। জিনিয়াস ফার্মস লিমিটেডের সিইও মেদিনা আলী জানান, এর ফলে ফসলের ফলন ১২-১৬ শতাংশ বেড়েছে এবং উৎপাদন খরচ গড়ে ৩৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাতেও জালিয়াতি রোধ ও গ্রাহক সেবায় এআই ব্যবহার শুরু হলেও দক্ষ জনবলের অভাবে পূর্ণ সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বিআইবিএম-এর ২০২৫ সালের জরিপ বলছে, মাত্র ৩২ শতাংশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক এআই নীতিমালা আছে এবং মাত্র ১১ শতাংশ ব্যাংক নিজেদের পুরোপুরি প্রস্তুত মনে করে। বিকাশ-এর মতো মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও ই-কেওয়াইসি ও ফ্রড শনাক্তকরণে এআই ব্যবহার করছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রযুক্তি আনলেই হবে না; ডাটা সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পাঠ্যক্রমে এআই-কে অন্তর্ভুক্ত করে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে না পারলে এই বিপুল সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 























