বাংলাদেশের ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে, যেখানে একই দিনে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে বহুল আলোচিত ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হবে। তবে ক্যালেন্ডারের পাতায় মাত্র এক মাস সময় বাকি থাকলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, সংসদ নির্বাচন নিয়ে উৎসবের আমেজ থাকলেও গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে চরম বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা। সিলেটের নলকট গ্রামের আজিজুর রহমান থেকে শুরু করে রাজশাহীর কৃষক শরিফুল ইসলাম—অধিকাংশ ভোটারই এখনো জানেন না গণভোটটি আসলে কীসের ওপর এবং কেন তাদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে হবে। ব্যালট পেপারে চারটি জটিল বিষয় (তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন সংস্কার, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষ গঠন) থাকলেও ভোটারদের কেবল একটি মাত্র উত্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত গোলমেলে ঠেকছে।
রাজনৈতিক ময়দানেও গণভোট নিয়ে দেখা গেছে স্পষ্ট বিভক্তি। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো একে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা’ রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখলেও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এ বিষয়ে অনেকটাই অনাগ্রহী। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, গণভোট প্রচারণার দায়িত্ব বিএনপির নয়। দলের অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী কেবল নিজেদের নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রচারেই ব্যস্ত। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ঢাকা-৯ আসনের এনসিপি প্রার্থী জাবেদ রাসিন তার লিফলেটের একপাশে নিজের প্রতীক এবং অন্যপাশে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, বাম দলগুলোর মধ্যে এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে সংশয় রয়েছে এবং বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা রাফিকুজ্জামান ফরিদ এই ভোট প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে দাবি করেছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ইতিমধ্যে সব সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রচারমূলক ব্যানার প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রায় ৮ কোটি লিফলেট বিতরণ ও ১৫ হাজার পরিবেশবান্ধব ব্যানার টাঙানোর কাজ শুরু করেছে। প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই প্রচারণার দুর্বলতা কেটে যাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দেশে আর কখনো ‘রাতের ভোট’ হবে না এবং একটি শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ পাবে। তবে বিভাগীয় শহরগুলোতে কর্মশালা বা ‘ভোটের গাড়ি’ চললেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে এখনো সংস্কারের এই বার্তা পৌঁছেনি। রাষ্ট্রকাঠামো বদলে দেওয়ার এই বিশাল কর্মকাণ্ডের অংশীদার হতে যাওয়া ভোটাররা যদি শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বুঝতে না পারেন, তবে এই ঐতিহাসিক ভোটাভুটি তার প্রকৃত সার্থকতা হারাবে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
রিপোর্টারের নাম 

























