টাইটেল: রপ্তানি খাতে বড় ধস: টানা পাঁচ মাসের পতনে হুমকির মুখে অর্থনীতির প্রাণশক্তি
মূল অংশ: রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনের ডামাডোল এবং বৈশ্বিক চাহিদা সংকোচনের এক ভয়াবহ প্রভাবে দেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত পাঁচ মাস ধরে টানা এই খাতের আয় কমছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুসারে, গত ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ কমে ৩৯৬ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। এই নিম্নমুখী ধারা আগস্ট মাস থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে দ্বিগুণ অঙ্কের পতনে রূপ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ২,৩৯৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ কোটি ডলার বা ২.১৯ শতাংশ কম। এই নেতিবাচক প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং কর্মসংস্থানের ওপর এর সরাসরি আঘাত আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
রপ্তানি খাতের এই ধসের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় কারণই দায়ী। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে কার্যাদেশ বা অর্ডার অন্যান্য বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব রপ্তানিকারকদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ যোগান দেয়, তা ডিসেম্বরেই ১৪.২৩ শতাংশ পতনের শিকার হয়েছে। ইউরোপের বাজারে অর্থনৈতিক মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আরোপিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পারস্পরিক শুল্ক নীতি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেক বিদেশি ক্রেতা এখন চীন, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যারা দ্রুত ও কম খরচে লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করছে।
এই পরিস্থিতি শুধু পোশাক খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; কৃষি পণ্য, হস্তশিল্প এবং চামড়া খাতের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। কৃষি পণ্যের রপ্তানি ১০.৩০ শতাংশ এবং হস্তশিল্পের রপ্তানি ১৫ শতাংশেরও বেশি কমেছে। উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন যে, আগামী জুন মাস পর্যন্ত এই মন্দা ভাব কাটার সম্ভাবনা খুবই কম। বিজিএমইএ-র সাবেক নেতৃবৃন্দ বলছেন, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ব্যাংক সংস্কারের ধীরগতির কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে ভয় পাচ্ছেন। এর ফলে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শিল্প মালিকরা দাবি করছেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে দ্রুত উৎপাদন খরচ কমানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ নীতি সহায়তা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চলতি বছরেই এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ। গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ অনেক বাণিজ্যিক সুবিধা সংকুচিত হয়ে আসবে। এই সংকটময় মুহূর্তে রপ্তানি খাতের এই ধারাবাহিক পতন অর্থনীতির ভিতকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সিপিডি-র মতো গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে এখনই কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ না করলে সংকট আরও গভীর হতে পারে। যদি দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং আমদানি সক্ষমতা বজায় রাখা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
রিপোর্টারের নাম 

























