ঢাকা ০১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

নতুন পাঠ্যবইয়ে উঠে এলো ভোট ডাকাতির ইতিহাস

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৫:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার ইতিহাস উঠে এসেছে। এছাড়াও এসব পাঠ্যবইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ইতিহাস ও গণমানুষের প্রত্যাশা, পরবর্তী রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও ঘটনাপ্রবাহ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্য নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে পাঠ্যবইয়ের গুণমানও আগের তুলনায় অনেক উন্নত করা হয়েছে। সংশোধিত পাঠ্যবইগুলো বছরের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালে প্রণীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছর পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য, গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল সাহিত্যের অংশ। এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ এবং বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বেশ কিছু পরিমার্জন ও পরবর্তী শাসনতান্ত্রিক ঘটনাপ্রবাহ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান যুক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় বিষয়বস্তুর পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে । ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে কলেবর বাড়ানো হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এখানেও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনা রয়েছে। এ অধ্যায়েও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি দেওয়া হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি রয়েছে। এছাড়া ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, নবম এবং দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাঠে’ বলা হয়েছেÑগণমানুষের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা-উত্তর দেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং সর্বজনীন মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এই প্রত্যাশা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়।

এতে আরো বলা হয়Ñ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন শুরু করেন। দুর্নীতির প্রসার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সীমা ছাড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল করেন। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকার করলে শুরু হয় সংকট।

এভাবে ভোটারবিহীন ও ভোট ডাকাতির ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার। এরপর ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ করে আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের এই নীলনকশা প্রত্যাখ্যান করে।

শেখ হাসিনার শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছেÑহাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চোরতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেওয়া হয় বলেও পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়।

জুলাই বিপ্লব নিয়ে পাঠ্যবইয়ে বলা হয়Ñচাকরিতে কোটা প্রথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা চব্বিশের জুন থেকে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন দমন করতে ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত), যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম হামলা চালালে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। পরদিন ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এ ঘটনায় সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে জনআক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনা সরকার আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে আপামর জনগণ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এতে প্রমাণিত হয়, নিপীড়ক শাসক যত শক্তিশালীই হোক, গণপ্রতিরোধে তার পরাজয় অনিবার্য।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী আমলে পাঠ্যবইয়ে অযাচিতভাবে নানা তথ্য সংযোজন করা হয়েছিল। শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিতভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে অতিরঞ্জিত বিভিন্ন তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। আর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে যে আক্রমণ, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেÑসেটিও তরুণ প্রজন্মের পাঠ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আগামী প্রজন্মকে সঠিকভাবে তথ্যগুলো জানাতেই সরকারের তরফ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর আমার দেশকে জানান, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) অনুমোদনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাঠ্যবইগুলোর এই পরিমার্জন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফোর্সেস গোল ২০৩০: পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার পথে বাংলাদেশ

নতুন পাঠ্যবইয়ে উঠে এলো ভোট ডাকাতির ইতিহাস

আপডেট সময় : ০৯:৩৫:২৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

চলতি শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণার ইতিহাস উঠে এসেছে। এছাড়াও এসব পাঠ্যবইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ইতিহাস ও গণমানুষের প্রত্যাশা, পরবর্তী রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও ঘটনাপ্রবাহ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্য নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে পাঠ্যবইয়ের গুণমানও আগের তুলনায় অনেক উন্নত করা হয়েছে। সংশোধিত পাঠ্যবইগুলো বছরের প্রথম দিন থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালে প্রণীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জন করে। এরই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছর পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য, গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল সাহিত্যের অংশ। এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ এবং বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বেশ কিছু পরিমার্জন ও পরবর্তী শাসনতান্ত্রিক ঘটনাপ্রবাহ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান যুক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় বিষয়বস্তুর পরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে । ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে কলেবর বাড়ানো হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণআন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এখানেও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের বর্ণনা রয়েছে। এ অধ্যায়েও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি দেওয়া হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও নব্বই ও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি রয়েছে। এছাড়া ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

পর্যালোচনায় আরো দেখা যায়, নবম এবং দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা পাঠে’ বলা হয়েছেÑগণমানুষের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা-উত্তর দেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র এবং সর্বজনীন মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এই প্রত্যাশা বারবার হোঁচট খেয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়।

এতে আরো বলা হয়Ñ২০০৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন হয়ে শেখ হাসিনা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষের ওপর দমন-নিপীড়ন শুরু করেন। দুর্নীতির প্রসার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার মাধ্যমে দলীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সীমা ছাড়িয়ে যায়। এরই মধ্যে শেখ হাসিনা তার ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা বাতিল করেন। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকার করলে শুরু হয় সংকট।

এভাবে ভোটারবিহীন ও ভোট ডাকাতির ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার। এরপর ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ করে আওয়ামী লীগ। জনগণ তাদের এই নীলনকশা প্রত্যাখ্যান করে।

শেখ হাসিনার শাসনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছেÑহাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের অর্থনৈতিক ফলাফল ছিল ধ্বংসাত্মক। ১৬ বছরে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে চোরতন্ত্র কায়েম করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও ভঙ্গুর করে দেওয়া হয় বলেও পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়।

জুলাই বিপ্লব নিয়ে পাঠ্যবইয়ে বলা হয়Ñচাকরিতে কোটা প্রথাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা চব্বিশের জুন থেকে আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলন দমন করতে ছাত্রলীগ (নিষিদ্ধ ঘোষিত), যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সরকারি বাহিনীর সঙ্গে জুলুম-নির্যাতন শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম হামলা চালালে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। পরদিন ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এ ঘটনায় সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজপথে জনআক্রোশের বিস্ফোরণ ঘটে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলন দমাতে শেখ হাসিনা সরকার আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে আপামর জনগণ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। এতে প্রমাণিত হয়, নিপীড়ক শাসক যত শক্তিশালীই হোক, গণপ্রতিরোধে তার পরাজয় অনিবার্য।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী আমলে পাঠ্যবইয়ে অযাচিতভাবে নানা তথ্য সংযোজন করা হয়েছিল। শেখ মুজিবকে অতিরঞ্জিতভাবে ছাত্রছাত্রীদের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে অতিরঞ্জিত বিভিন্ন তথ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। আর জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে যে আক্রমণ, নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেÑসেটিও তরুণ প্রজন্মের পাঠ হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আগামী প্রজন্মকে সঠিকভাবে তথ্যগুলো জানাতেই সরকারের তরফ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক ফাতিহুল কাদীর আমার দেশকে জানান, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) অনুমোদনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাঠ্যবইগুলোর এই পরিমার্জন চূড়ান্ত করা হয়েছে।