ঢাকা ০৮:২১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনমনে ভারতের দায়

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নথি বা শীর্ষ বৈঠকের হাসিমুখে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এই সম্পর্কের প্রকৃত তাপমাত্রা নির্ধারিত হয় জনগণের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও ন্যায়ের অনুভূতি দিয়ে। সেই জায়গা থেকেই আজ বাংলাদেশের বড় একটি অংশ মনে করে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দাগি অপরাধী, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তি, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত কিংবা খুনের মামলার পলাতকদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে, যা দ্বিপক্ষীয় আস্থাকে শুধুই ক্ষয় করেছে। এই ধারণা এক দিনে তৈরি হয়নি; এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের স্তর।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার (যদিও ভারতের একক পলিসিতে) ভিত্তিতে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্নে পারস্পরিক সন্দেহ জমেছে। আশির দশক থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় ও ভারত সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও সংসদীয় আলোচনায় নিয়মিত এসেছে। নব্বই ও দুই হাজারের দশকে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ তোলে, কিন্তু কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অনিচ্ছা এই ইস্যুকে ঝুলিয়ে রাখে (Bangladesh-India Joint Communiqué, 2010)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ও পলাতকদের আশ্রয়কে আঞ্চলিক আস্থাহীনতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভের আরেকটি উৎস হলো এই উপলব্ধি যে, ভারত সম্পর্ক রক্ষায় সমতার বদলে ক্ষমতার ভাষা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। রাষ্ট্র ও জনগণকে একপাশে রেখে নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক, গণতন্ত্র হত্যা, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বা বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুতে যখন ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠে, তখনই ভারত নানা ধরনের ‘চাপের রাজনীতি’ নিয়ে হাজির হয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশীর সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে কৌশলগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত নেতিবাচক হয় (Barry Buzan, Regional Security Complex Theory, 2003)।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধিতা চর্চা করতে আগ্রহী নয়; বরং তারা ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। আজ যে ভারতবিরোধী মনোভাব দৃশ্যমান, তা কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; এটি একটি প্রতিক্রিয়া। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ভারতের নেই। যদি তারা সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, তবে পলাতক অপরাধীদের প্রশ্নে স্বচ্ছতা, প্রত্যর্পণে আন্তরিকতা এবং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বোধকে সম্মান করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ। অন্যথায় শাসনের রাজদণ্ড দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখার যে কৌশল, তা কাগজে-কলমে টিকলেও মানুষের মনে কখনোই উষ্ণতা তৈরি করতে পারবে না।

এই বাস্তবতার সঙ্গে আরো কয়েকটি গুরুতর ইস্যু যুক্ত না করলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটের পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। সীমান্ত হত্যা, একতরফা নদীশাসন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অভিযোগ। এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের জনগণের মানসিকতায় ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে আরো গভীর করেছে এবং আগের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে একটি সামগ্রিক অনাস্থার কাঠামো তৈরি করেছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ফটিকছড়িতে গুলিতে যুবক নিহত: জামায়াত কর্মীর পরিচয় দাবি, থমথমে জনপদ, মেলেনি মামলা

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক অবনমনে ভারতের দায়

আপডেট সময় : ০৬:১১:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নথি বা শীর্ষ বৈঠকের হাসিমুখে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এই সম্পর্কের প্রকৃত তাপমাত্রা নির্ধারিত হয় জনগণের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও ন্যায়ের অনুভূতি দিয়ে। সেই জায়গা থেকেই আজ বাংলাদেশের বড় একটি অংশ মনে করে ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের দাগি অপরাধী, রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তি, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত কিংবা খুনের মামলার পলাতকদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে, যা দ্বিপক্ষীয় আস্থাকে শুধুই ক্ষয় করেছে। এই ধারণা এক দিনে তৈরি হয়নি; এর পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসের স্তর।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার (যদিও ভারতের একক পলিসিতে) ভিত্তিতে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্নে পারস্পরিক সন্দেহ জমেছে। আশির দশক থেকে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় ও ভারত সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশি গণমাধ্যম ও সংসদীয় আলোচনায় নিয়মিত এসেছে। নব্বই ও দুই হাজারের দশকে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক অপরাধীদের প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গ তোলে, কিন্তু কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক অনিচ্ছা এই ইস্যুকে ঝুলিয়ে রাখে (Bangladesh-India Joint Communiqué, 2010)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ ও পলাতকদের আশ্রয়কে আঞ্চলিক আস্থাহীনতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের জনমনে ক্ষোভের আরেকটি উৎস হলো এই উপলব্ধি যে, ভারত সম্পর্ক রক্ষায় সমতার বদলে ক্ষমতার ভাষা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। রাষ্ট্র ও জনগণকে একপাশে রেখে নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে সম্পর্ক, গণতন্ত্র হত্যা, পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বা বাণিজ্য ঘাটতির মতো ইস্যুতে যখন ন্যায্যতার প্রশ্ন ওঠে, তখনই ভারত নানা ধরনের ‘চাপের রাজনীতি’ নিয়ে হাজির হয়। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো রাষ্ট্র প্রতিবেশীর সার্বভৌম উদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে কৌশলগত সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত নেতিবাচক হয় (Barry Buzan, Regional Security Complex Theory, 2003)।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, বাংলাদেশের জনগণ ভারতবিরোধিতা চর্চা করতে আগ্রহী নয়; বরং তারা ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। আজ যে ভারতবিরোধী মনোভাব দৃশ্যমান, তা কোনো আকস্মিক আবেগ নয়; এটি একটি প্রতিক্রিয়া। এই দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ভারতের নেই। যদি তারা সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল সম্পর্ক চায়, তবে পলাতক অপরাধীদের প্রশ্নে স্বচ্ছতা, প্রত্যর্পণে আন্তরিকতা এবং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বোধকে সম্মান করাই হবে বাস্তবসম্মত পথ। অন্যথায় শাসনের রাজদণ্ড দিয়ে সম্পর্ক ধরে রাখার যে কৌশল, তা কাগজে-কলমে টিকলেও মানুষের মনে কখনোই উষ্ণতা তৈরি করতে পারবে না।

এই বাস্তবতার সঙ্গে আরো কয়েকটি গুরুতর ইস্যু যুক্ত না করলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটের পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। সীমান্ত হত্যা, একতরফা নদীশাসন এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অভিযোগ। এই তিনটি বিষয় বাংলাদেশের জনগণের মানসিকতায় ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাকে আরো গভীর করেছে এবং আগের অভিযোগগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে একটি সামগ্রিক অনাস্থার কাঠামো তৈরি করেছে।