ঢাকা ১২:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

আশঙ্কাজনক হারে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর: অস্তিত্বের সংকটে নদীমাতৃক বাংলাদেশ

নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরায়ত পরিচয়ের আড়ালে এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। পানির অপর নাম জীবন হলেও, সেই জীবনের প্রধান উৎস ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া এখন দেশের জন্য এক চরম অশনিসংকেত। জাতিসংঘের ক্রমাগত সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মাটির নিচের পানির ওপর আমাদের অতিমাত্রিক নির্ভরতা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই ডেকে আনছে না, বরং দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও এক গভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের মোট ব্যবহৃত পানির প্রায় ৭৯ শতাংশই উত্তোলিত হয় মাটির নিচ থেকে, যা একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বড় অন্তরায়।

রাজধানী ঢাকার দিকে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঢাকা ওয়াসার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেগাসিটির দৈনিক চাহিদার প্রায় ২৪০ কোটি লিটার পানির ৮৭ শতাংশই আসে গভীর নলকূপের মাধ্যমে। নির্বিচারে এই উত্তোলনের ফলে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির আধার বা একুইফারগুলো এখন ক্রমে ফাঁপা ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়ছে। অথচ ঢাকায় বছরে গড়ে দুই হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কংক্রিটের আধিক্যের কারণে সেই পানি মাটির নিচে পৌঁছাতে পারছে না। প্রকৃতি অকাতরে পানি দিলেও আমাদের অব্যবস্থাপনার কারণে তা অপচয় হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, ১৯৯০ সালে ঢাকার পানির স্তর যেখানে মাত্র ১১ থেকে ১৫ মিটার গভীরে ছিল, বর্তমানে তা মিরপুর বা উত্তরা অঞ্চলে ৭৫ থেকে ৮০ মিটারের নিচে নেমে গেছে। বছরে গড়ে দুই থেকে তিন মিটার হারে এই পতন ঢাকাকে বিশ্বের দ্রুততম পানিশূন্য হতে যাওয়া শহরগুলোর তালিকায় নিয়ে এসেছে।

পানির এই স্তর নেমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। গভীর স্তর থেকে পানি তুলতে পাম্পগুলোতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত বাড়ছে পানির বিলের মাধ্যমে। যা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে।

দেশের প্রাণভোমরা কৃষি খাতও এই সংকটের বাইরে নয়। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থার ৮০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ ব্যয় হয় বোরো ধান চাষে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে গড়ে ৫৫০ থেকে ৬৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপনের খরচ গত দেড় দশকে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন; তারা হয় চড়া দামে পানি কিনছেন, নতুবা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে পানির সহজলভ্যতা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষমতা ও সম্পদের নতুন নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আর্সেনিক দূষণ। পানির স্তর অতিরিক্ত নিচে নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে অক্সিজেনের প্রবেশ ঘটে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক মিশিয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ এখনো এই বিষাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। আর্সেনিকোসিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ কেবল জনস্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং কর্মক্ষমতা কমিয়ে জাতীয় উৎপাদনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভৌগোলিক ও ঋতুভেদে এই সংকট আরও প্রকট হয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৩৫ শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষ তখন দূষিত উৎসের ওপর নির্ভর করে, যা টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। গ্রামীণ এই পানিসংকট মানুষকে শহরমুখী হতে বাধ্য করছে, যা শহরের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। নদী শুকিয়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাংলাদেশ একই সাথে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির শিকলে বন্দি হয়ে পড়ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। মাটির নিচের এই অদৃশ্য সম্পদ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক তৃষ্ণার্ত ও মরুপ্রায় বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দোকানে দোকানে ঈদ পোশাকের রঙিন পসরা, জমে উঠছে কেনাকাটা

আশঙ্কাজনক হারে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর: অস্তিত্বের সংকটে নদীমাতৃক বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১০:৩৩:৫৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ মার্চ ২০২৬

নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরায়ত পরিচয়ের আড়ালে এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার ছায়া ঘনীভূত হচ্ছে। পানির অপর নাম জীবন হলেও, সেই জীবনের প্রধান উৎস ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া এখন দেশের জন্য এক চরম অশনিসংকেত। জাতিসংঘের ক্রমাগত সতর্কবার্তা সত্ত্বেও মাটির নিচের পানির ওপর আমাদের অতিমাত্রিক নির্ভরতা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ই ডেকে আনছে না, বরং দেশের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, কৃষি এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও এক গভীর ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের মোট ব্যবহৃত পানির প্রায় ৭৯ শতাংশই উত্তোলিত হয় মাটির নিচ থেকে, যা একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বড় অন্তরায়।

রাজধানী ঢাকার দিকে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঢাকা ওয়াসার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেগাসিটির দৈনিক চাহিদার প্রায় ২৪০ কোটি লিটার পানির ৮৭ শতাংশই আসে গভীর নলকূপের মাধ্যমে। নির্বিচারে এই উত্তোলনের ফলে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির আধার বা একুইফারগুলো এখন ক্রমে ফাঁপা ও ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে পড়ছে। অথচ ঢাকায় বছরে গড়ে দুই হাজার মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও কংক্রিটের আধিক্যের কারণে সেই পানি মাটির নিচে পৌঁছাতে পারছে না। প্রকৃতি অকাতরে পানি দিলেও আমাদের অব্যবস্থাপনার কারণে তা অপচয় হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতে, ১৯৯০ সালে ঢাকার পানির স্তর যেখানে মাত্র ১১ থেকে ১৫ মিটার গভীরে ছিল, বর্তমানে তা মিরপুর বা উত্তরা অঞ্চলে ৭৫ থেকে ৮০ মিটারের নিচে নেমে গেছে। বছরে গড়ে দুই থেকে তিন মিটার হারে এই পতন ঢাকাকে বিশ্বের দ্রুততম পানিশূন্য হতে যাওয়া শহরগুলোর তালিকায় নিয়ে এসেছে।

পানির এই স্তর নেমে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। গভীর স্তর থেকে পানি তুলতে পাম্পগুলোতে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যার দায় শেষ পর্যন্ত বাড়ছে পানির বিলের মাধ্যমে। যা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা ছিল, তা এখন চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে।

দেশের প্রাণভোমরা কৃষি খাতও এই সংকটের বাইরে নয়। বাংলাদেশের সেচব্যবস্থার ৮০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল, যার বড় অংশ ব্যয় হয় বোরো ধান চাষে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে গড়ে ৫৫০ থেকে ৬৫০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপনের খরচ গত দেড় দশকে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এতে প্রান্তিক কৃষকরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন; তারা হয় চড়া দামে পানি কিনছেন, নতুবা চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে পানির সহজলভ্যতা এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষমতা ও সম্পদের নতুন নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো আর্সেনিক দূষণ। পানির স্তর অতিরিক্ত নিচে নেমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ শিলাস্তরে অক্সিজেনের প্রবেশ ঘটে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিক মিশিয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ এখনো এই বিষাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। আর্সেনিকোসিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ কেবল জনস্বাস্থ্যকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং কর্মক্ষমতা কমিয়ে জাতীয় উৎপাদনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভৌগোলিক ও ঋতুভেদে এই সংকট আরও প্রকট হয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ৩৫ শতাংশ নলকূপ অকেজো হয়ে পড়ে। নিরাপদ পানির অভাবে মানুষ তখন দূষিত উৎসের ওপর নির্ভর করে, যা টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। গ্রামীণ এই পানিসংকট মানুষকে শহরমুখী হতে বাধ্য করছে, যা শহরের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক নদীগুলোর উজানে বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে দেশের নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। নদী শুকিয়ে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কমে যায়। ফলে বাংলাদেশ একই সাথে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির শিকলে বন্দি হয়ে পড়ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের এখনই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং বাধ্যতামূলক করা, শিল্পকারখানায় পানির পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। মাটির নিচের এই অদৃশ্য সম্পদ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক তৃষ্ণার্ত ও মরুপ্রায় বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।