ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরাইল সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার এবং একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সফরে মোদি ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি আগ্রাসন ও গণহত্যার প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে ইসরাইল ও নেতানিয়াহুর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি ইসরাইলকে কেন্দ্র করে কয়েকটি দেশ নিয়ে দুটি নতুন জোট গঠনের প্রস্তাবও তুলে ধরেছেন, যা ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি থেকে একটি স্পষ্ট সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে মোদি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ভারত সব পরিস্থিতিতে ইসরাইলের পাশে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে ‘বর্বর’ অভিহিত করে ভারতের পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। তবে, তিনি গাজায় ইসরাইলি হামলায় নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহতের ঘটনা, অস্ত্রবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও চলমান হত্যাকাণ্ড এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলের প্রতি মোদির এই অবস্থান ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে একটি বড় ধরনের বিচ্যুতি। বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, মোদির দল বিজেপি এবং ইসরাইলের জায়নবাদী আদর্শের মধ্যে যথেষ্ট কাঠামোগত মিল রয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের দেশকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ‘স্বাভাবিক জন্মভূমি’ হিসেবে গড়ে তোলার অভিন্ন লক্ষ্য পোষণ করে। মোদি তার বক্তব্যে এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারত যখন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়, সেদিনই যেন তার জন্ম হয়েছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জেরুসালেমে ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেওয়ার সময় দুই দেশের মধ্যে গভীর সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরেন, যা ২০১৪ সালে তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দ্রুতগতিতে উন্নত হয়েছে। ইসরাইলে তার দুই দিনের সফরের প্রথম দিনে দেওয়া এই ভাষণের সময় মোদি প্রস্তাবিত ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) এবং আই২ইউ২-সহ বিভিন্ন প্রকল্পে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন।
আইএমইসি প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ঘোষণা করা হয়। এটি একটি প্রস্তাবিত অবকাঠামো প্রকল্প যা ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে একটি সমন্বিত রেল ও নৌ করিডোরের মাধ্যমে সংযুক্ত করবে। এই করিডোর ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইসরাইল এবং ইউরোপের মধ্য দিয়ে যাবে এবং এর রুটে সরবরাহ ও বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহকে সহজতর করার জন্য রেলওয়ে, বন্দর ও মহাসড়কের একটি নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত করবে। প্রকল্পের লক্ষ্য হলো টেকসই অবকাঠামো প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সবুজ উন্নয়নকে উৎসাহিত করা।
অন্যদিকে, আই২ইউ২ গ্রুপটি ভারত, ইসরাইল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের ১৪ জুলাই এক ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে। কিছু বিশ্লেষক এই গ্রুপকে ‘পশ্চিম এশিয়ান কোয়াড’ বা ‘মধ্যপ্রাচ্যের কোয়াড’ নামে অভিহিত করেছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতকে নিয়ে গঠিত চারদেশীয় অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা ফোরাম কোয়াড্রিলেটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগের (কোয়াড) অনুরূপ একটি নিরাপত্তা ফোরাম। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, আই২ইউ২ পানি, জ্বালানি, পরিবহন, মহাকাশ, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রকল্প এবং উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এর লক্ষ্য অবকাঠামো আধুনিকীকরণ, কম কার্বন নিঃসরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতি করা। এই গ্রুপের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ভারতে একটি খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্প, গুজরাট রাজ্যে একটি হাইব্রিড নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প এবং মহাকাশভিত্তিক পর্যবেক্ষণ তথ্য ও ক্ষমতা ব্যবহার করে পরিবেশগত ও জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রকল্প।
ভারতের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এর আশেপাশে জটিল ও ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমিতে মোদি ইসরাইল সফর করেন। গত শতকের বিশ ও তিরিশের দশকে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকাকালে ভারত ফিলিস্তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে একাত্ম ছিল। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে ভারত প্রথমে ইসরাইলের সৃষ্টি এবং জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের বিরোধিতা করেছিল। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বিলম্বিত হয়েছিল, এরপর পরবর্তী ২০ বছর ধরে ভারত-ইসরাইল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রসারিত হয়। মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও পরিবর্তন এসেছে। ২০১৭ সালে মোদি প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরাইল সফর করেছিলেন। বর্তমানে ভারত চীনের পর এশিয়ায় ইসরাইলের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে বাণিজ্য ২০০ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা প্রোগ্রামের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের মধ্যে ভারতকে উদীয়মান বাণিজ্য ও প্রযুক্তি করিডোরের কেন্দ্রে পরিণত করে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও গভীর করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে মোদি আইএমইসি এবং আই২ইউ২-এর ওপর জোর দিচ্ছেন।
আইএমইসি এবং আই২ইউ২-এর মতো সহযোগিতামূলক প্রকল্পগুলো ভারত ও ইসরাইলের মধ্যে সম্প্রসারিত অংশীদারত্বের কেন্দ্রীয় উপাদান। উপরন্তু, এগুলো ভারত ও ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত করে। সানাম ভাকিল আরও বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য আইএমইসি এবং আই২ইউ২ তেলের বাইরে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে তাদের ভূমিকা সুদৃঢ় করার সুযোগ প্রদান করে। তবে, আমিরাত ও সৌদি নীতিগত প্রতিযোগিতা এবং ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরাইলের অবস্থান অনিবার্যভাবে আইএমইসি’র মতো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সংহতিকে জটিল করে তোলে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যেই ইসরাইল সফর করেন নরেন্দ্র মোদি। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের সম্প্রসারণ কার্যক্রমের নিন্দা জানাতে একশটিরও বেশি দেশের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে কিছুটা সময় নিয়েছে ভারত। এই পদক্ষেপ নিতে মোদি সরকার এক দিন বিলম্ব করেছে, যার মূল কারণ ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এই সপ্তাহে নেতানিয়াহু বলেছেন, তিনি একটি নতুন আঞ্চলিক ব্লক গঠনের পরিকল্পনা করছেন, যাকে তিনি ‘মৌলবাদী’ সুন্নি ও শিয়া মুসলিম অক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য ‘ষড়ভুজ’ জোট বলে অভিহিত করেছেন। গত রোববার নেতানিয়াহু বলেন, এই জোটে ইসরাইল, ভারত, গ্রিস ও সাইপ্রাস এবং কয়েকটি আরব, আফ্রিকান ও এশীয় দেশ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে ভারতসহ এসব দেশের কোনোটিই আনুষ্ঠানিকভাবে নেতানিয়াহুর এই পরিকল্পনাকে সমর্থন জানায়নি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে সীমিত হামলার হুমকি দেওয়ার পর ইরানের কাছাকাছি এলাকায় বিমানবাহী রণতরীসহ বড় নৌবহর মোতায়েন করছেন এবং শক্তির মাত্রা ক্রমেই বাড়াচ্ছেন। তেহরান বলেছে, তারা কূটনীতি পছন্দ করে, তবে আক্রমণ করা হলে আত্মরক্ষা করবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানে মার্কিন হামলা শুরু হলে এই আগ্রাসনে ইসরাইল সম্ভবত সামনের সারিতেই থাকবে।
রিপোর্টারের নাম 

























