ঢাকা ০৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ভূগর্ভস্থ তেল পাইপলাইনে অভিনব চুরি: নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত কমিটি

চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জাতীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ পাইপলাইন ছিদ্র করে অভিনব কায়দায় হাজার হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক ও সুরক্ষিত এই ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনে এমন চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনা এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনার তদন্তে বিপিসি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে এবং মীরসরাই থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মীরসরাইয়ের হাদিফকিরহাটে পাইপলাইনের ওপর একটি অস্থায়ী টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে এই তেল চুরি চলছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে পাইপলাইনে তেলের চাপ বেড়ে যাওয়ায় চোরাই সংযোগটি ফেটে যায় এবং বিপুল পরিমাণ তেল আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা বালতি ও হাড়িপাতিল নিয়ে তেল সংগ্রহ শুরু করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। খবর পেয়ে মীরসরাই থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিপিসি কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সিলগালা করে দেন।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি ও চুরি হওয়া তেলের পরিমাণ নিরূপণে বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সাথে, বিপিসির ডিজিএম প্রশাসন (অর্থ) মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে মীরসরাই থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আবসার নামে একজনকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। মীরসরাই থানার ওসি ফরিদা ইয়াসমিন জানান, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।

উল্লেখ্য, সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করে। নৌপথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে সময়, খরচ ও সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্যেই এই বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, স্ক্যাডা সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল এবং লিক ডিটেকশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো পাইপলাইন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে এতে কোনো ধরনের চুরির সুযোগ নেই। এমন সুরক্ষিত ব্যবস্থায় চুরির ঘটনা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি নিছকই কোনো সাধারণ তেল চুরির ঘটনা নাকি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সুপরিকল্পিত কারসাজি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ডিপোগুলো থেকে এর আগে লুট হওয়া লাখ লাখ লিটার তেলের সঙ্গে এই অভিনব চুরির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, তাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। অন্যথায় ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো আরও বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এই তদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মার্কিন এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি রাশিয়ার; পাল্টা হামলায় উত্তাল কাস্পিয়ান সাগর

ভূগর্ভস্থ তেল পাইপলাইনে অভিনব চুরি: নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, তদন্ত কমিটি

আপডেট সময় : ১২:৪১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) জাতীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ পাইপলাইন ছিদ্র করে অভিনব কায়দায় হাজার হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অত্যাধুনিক ও সুরক্ষিত এই ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনে এমন চাঞ্চল্যকর চুরির ঘটনা এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। এই ঘটনার তদন্তে বিপিসি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে এবং মীরসরাই থানায় একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মীরসরাইয়ের হাদিফকিরহাটে পাইপলাইনের ওপর একটি অস্থায়ী টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে এই তেল চুরি চলছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে পাইপলাইনে তেলের চাপ বেড়ে যাওয়ায় চোরাই সংযোগটি ফেটে যায় এবং বিপুল পরিমাণ তেল আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা বালতি ও হাড়িপাতিল নিয়ে তেল সংগ্রহ শুরু করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। খবর পেয়ে মীরসরাই থানা পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিপিসি কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সিলগালা করে দেন।

বিপিসি সূত্রে জানা যায়, পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতি ও চুরি হওয়া তেলের পরিমাণ নিরূপণে বিপিসির ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মিজানুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। একই সাথে, বিপিসির ডিজিএম প্রশাসন (অর্থ) মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে মীরসরাই থানায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আবসার নামে একজনকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। মীরসরাই থানার ওসি ফরিদা ইয়াসমিন জানান, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।

উল্লেখ্য, সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল হয়ে ঢাকার ফতুল্লা পর্যন্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করে। নৌপথে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে সময়, খরচ ও সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্যেই এই বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্বোধনের সময় বলা হয়েছিল, স্ক্যাডা সিস্টেম, অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল এবং লিক ডিটেকশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পুরো পাইপলাইন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে এতে কোনো ধরনের চুরির সুযোগ নেই। এমন সুরক্ষিত ব্যবস্থায় চুরির ঘটনা সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এটি নিছকই কোনো সাধারণ তেল চুরির ঘটনা নাকি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সুপরিকল্পিত কারসাজি, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ডিপোগুলো থেকে এর আগে লুট হওয়া লাখ লাখ লিটার তেলের সঙ্গে এই অভিনব চুরির কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, তাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। অন্যথায় ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো আরও বড় ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এই তদন্ত প্রতিবেদনের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।