ঢাকা ০৮:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

ঝিনাইদহে বিধবার ওপর পাশবিকতা: ‘অসামাজিক’ তকমা দিয়ে গণবিচার, আইনের শাসন কোথায়?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক বিধবা হিন্দু নারীকে ধর্ষণ, গাছে বেঁধে চুল কেটে নির্যাতন এবং তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর ওপর এমন পাশবিকতার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে ওই নারী ‘অসামাজিক’ কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন এবং তাকে ‘হাতেনাতে’ ধরার পরেই এই ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারোর আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার বাড়িতে দুই পুরুষ আত্মীয়ের আগমনের সুযোগে শাহীন ও হাসান নামের দুই ব্যক্তি প্রবেশ করে। তারা আত্মীয়দের একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে অন্য কক্ষে ধর্ষণ করে। এরপর ওই নারী ও তার দুই আত্মীয়কে বাড়ির বাইরে এনে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ‘কুকর্মের’ অভিযোগ তুলে ভিডিও ধারণ করা হয়। এ সময় শাহীন ও হাসান ভুক্তভোগীর চুল কেটে মারধর করেন এবং মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ জানুয়ারি ভুক্তভোগী বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের ভিন্নমত এই ঘটনার বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভুক্তভোগী নারী দীর্ঘদিন ধরে ‘অসামাজিক’ কাজে জড়িত ছিলেন। প্রতিবেশীরা তাকে ‘হাতেনাতে’ ধরে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। এমনকি নির্যাতনের শিকার নারীর ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ বন্ধের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি সকালে শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছিল, যা পুলিশ এসে পণ্ড করে দেয়।

এলাকাবাসীর এই কর্মকাণ্ড আইনগতভাবে কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘অসামাজিক কাজ’ বিষয়টি কে নির্ধারণ করবে? এর বিপরীতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা যা করেছে, তা সুস্পষ্টভাবে অপরাধ এবং এর বিচার হওয়া প্রয়োজন। ভিডিও প্রকাশ করে ভুক্তভোগীকে আরও অনিরাপদ করে তোলারও কোনো আইনি সুযোগ নেই।

আইনজীবীরা বলছেন, কোনো অভিযোগ থাকলে আইনি পথে সমাধান চাইতে হবে, আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কারোর নেই। পেনাল কোড অনুযায়ী, স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বামী অভিযোগ আনতে পারেন, জনতা নয়। উৎসাহিত হয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক কারণকে পুঁজি করে এভাবে গণপিটুনি বা নির্যাতন চালানো আমাদের ধর্ম বা আইন কোনোটাই সমর্থন করে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, নয়তো এমন ঘটনা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার মেডিকেল রিপোর্ট এখনও আসেনি, তবে প্রস্তুত হলে দ্রুত থানায় পাঠানো হবে।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন নিশ্চিত করেছেন, থানায় মামলা হয়েছে এবং এক আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। প্রধান আসামিসহ বাকিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। এই ঘটনা আবারও সমাজের গভীরে প্রোথিত বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জুলাই গণহত্যার বিচার হবে আপসহীন, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের দাবি শিক্ষার্থীদের: প্রসিকিউটর তামীম

ঝিনাইদহে বিধবার ওপর পাশবিকতা: ‘অসামাজিক’ তকমা দিয়ে গণবিচার, আইনের শাসন কোথায়?

আপডেট সময় : ০৮:১৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে এক বিধবা হিন্দু নারীকে ধর্ষণ, গাছে বেঁধে চুল কেটে নির্যাতন এবং তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর ওপর এমন পাশবিকতার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘ দিন ধরে ওই নারী ‘অসামাজিক’ কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলেন এবং তাকে ‘হাতেনাতে’ ধরার পরেই এই ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারোর আছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার বাড়িতে দুই পুরুষ আত্মীয়ের আগমনের সুযোগে শাহীন ও হাসান নামের দুই ব্যক্তি প্রবেশ করে। তারা আত্মীয়দের একটি কক্ষে আটকে রেখে তাকে অন্য কক্ষে ধর্ষণ করে। এরপর ওই নারী ও তার দুই আত্মীয়কে বাড়ির বাইরে এনে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ‘কুকর্মের’ অভিযোগ তুলে ভিডিও ধারণ করা হয়। এ সময় শাহীন ও হাসান ভুক্তভোগীর চুল কেটে মারধর করেন এবং মোবাইলে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

ঘটনার পাঁচ দিন পর ৫ জানুয়ারি ভুক্তভোগী বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ইতোমধ্যে এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে এবং বাকিদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে।

তবে স্থানীয়দের ভিন্নমত এই ঘটনার বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভুক্তভোগী নারী দীর্ঘদিন ধরে ‘অসামাজিক’ কাজে জড়িত ছিলেন। প্রতিবেশীরা তাকে ‘হাতেনাতে’ ধরে এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। এমনকি নির্যাতনের শিকার নারীর ‘অসামাজিক কার্যকলাপ’ বন্ধের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি সকালে শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছিল, যা পুলিশ এসে পণ্ড করে দেয়।

এলাকাবাসীর এই কর্মকাণ্ড আইনগতভাবে কতটা সমর্থনযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘অসামাজিক কাজ’ বিষয়টি কে নির্ধারণ করবে? এর বিপরীতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা যা করেছে, তা সুস্পষ্টভাবে অপরাধ এবং এর বিচার হওয়া প্রয়োজন। ভিডিও প্রকাশ করে ভুক্তভোগীকে আরও অনিরাপদ করে তোলারও কোনো আইনি সুযোগ নেই।

আইনজীবীরা বলছেন, কোনো অভিযোগ থাকলে আইনি পথে সমাধান চাইতে হবে, আইন হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ কারোর নেই। পেনাল কোড অনুযায়ী, স্ত্রীর সম্পর্কের বিষয়ে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বামী অভিযোগ আনতে পারেন, জনতা নয়। উৎসাহিত হয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক কারণকে পুঁজি করে এভাবে গণপিটুনি বা নির্যাতন চালানো আমাদের ধর্ম বা আইন কোনোটাই সমর্থন করে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করে বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা, নয়তো এমন ঘটনা সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তার মেডিকেল রিপোর্ট এখনও আসেনি, তবে প্রস্তুত হলে দ্রুত থানায় পাঠানো হবে।

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জেল্লাল হোসেন নিশ্চিত করেছেন, থানায় মামলা হয়েছে এবং এক আসামি গ্রেফতার হয়েছেন। প্রধান আসামিসহ বাকিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। এই ঘটনা আবারও সমাজের গভীরে প্রোথিত বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।