ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও ইসরায়েল সেখানে চরম নৃশংসতা অব্যাহত রাখায় এই বিরতি টেকসই হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে আজ ইসরায়েল সফর করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
গাজায় গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে হামাস ও ইসরায়েল একাধিকবার একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। ইসরায়েল অভিযোগ করে যে হামাস তাদের দুই সেনাকে হত্যা করেছে। এই অভিযোগ তুলে ইসরায়েলি বাহিনী গত রোববার গাজায় ব্যাপক হামলা চালায়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন, সেদিন গাজায় ১৫৩ টন বোমা ফেলা হয়েছে, যাতে এক দিনে অন্তত ৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হন। যদিও হামাস ইসরায়েলি সেনাদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
গত সোমবার ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু দম্ভের সঙ্গে বলেন, ‘আমাদের এক হাতে অস্ত্র। আর অন্য হাত শান্তির জন্য বাড়িয়ে দেওয়া রয়েছে। দুর্বলের সঙ্গে নয়, বরং শক্তিশালীর সঙ্গে শান্তি স্থাপন করুন। ইসরায়েল এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।’
নেতানিয়াহুর মুখে শান্তির কথা থাকলেও মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন। আজ মঙ্গলবার থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় গাজার হাসপাতালগুলোতে ইসরায়েলের হামলায় নিহত আরও ১৩ জনের মরদেহ আনা হয়েছে বলে স্থানীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা অন্তত ৬৮ হাজার ২২৯ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মানুষ।
এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজায় ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। উপত্যকার দক্ষিণে রাফা সীমান্ত বন্ধ রেখেছে তারা এবং মাত্র দুটি সীমান্ত দিয়ে গাজাবাসীর জন্য ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। গাজার গণমাধ্যম কার্যালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে উপত্যকায় ৬ হাজার ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও, সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র ৯৮৬ ট্রাক প্রবেশ করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আজ গাজায় ত্রাণ প্রবেশের জন্য সব পথ খুলে দেওয়া ‘অত্যন্ত জরুরি’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি তাঁর দেশের শুরা কাউন্সিলে দেওয়া বক্তব্যে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের নিন্দা জানান এবং উপত্যকাটিতে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে জাতিগত নিধন ছাড়া কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন।
গাজায় প্রথম ধাপে যে যুদ্ধবিরতি চলছে, তার ভিত্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা। কিন্তু ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাওয়ায় এই যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাও মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে সরে গিয়ে আবার পুরোদমে হামলা শুরু করতে পারেন বলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এমন উদ্বেগের মধ্যেই আজ ইসরায়েলে পৌঁছেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স। এর আগের দিন ট্রাম্পের জামাতা জেরাড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইসরায়েলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মার্কিন নেতাদের সফরের লক্ষ্য হলো নতুন করে সংঘাত ঠেকানো এবং যুদ্ধবিরতির পরের ধাপ নিয়ে আলোচনা করা।
ইসরায়েল সফরে গিয়ে আজ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাহিনীর প্রধান কার্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল ভ্যান্সের। সেখানে সংঘাত পরবর্তী গাজার নিরাপত্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী নিয়ে আলোচনার কথা ছিল তাঁর। এদিনই যুদ্ধবিরতি নিয়ে স্টিভ উইটকফ ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য মিসরের গোয়েন্দাপ্রধানসহ একটি প্রতিনিধিদলের ইসরায়েলে যাওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে, হামাস নেতা খলিল আল-হায়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলও মিসরের রাজধানী কায়রোয় যুদ্ধবিরতির পরের ধাপ নিয়ে বৈঠক করছে। হামাসের এই নেতা আশা প্রকাশ করেছেন যে গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন শেষ হয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আলোচনার মধ্যস্থতাকারীরা তাঁদের নিশ্চিত করেছেন এবং কায়রোর বৈঠকের পর গাজায় ত্রাণ সরবরাহ বাড়বে।
রিপোর্টারের নাম 





















