২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বইছে উত্তাল হাওয়া। ইনকিলাব মঞ্চের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং এর পরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ও তারেক রহমানের বীরোচিত প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একদিকে হাদি হত্যার বিচার দাবিতে রাজপথে ছাত্র-জনতার ক্ষোভ, অন্যদিকে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে আসা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে দেশ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড ও ঘনীভূত বিচারহীনতার শঙ্কা
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও মূল খুনিরা ধরা না পড়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনে জুমার নামাজের পর তাকে মাথায় গুলি করা হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে যে এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামী ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয়ে পালিয়ে গেছে। যদিও মেঘালয় পুলিশ তাদের সহায়তাকারী দুই ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু মূল আসামীদের ফিরিয়ে আনা নিয়ে জটিলতা রয়ে গেছে। নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ঝালকাঠিতে এক জনসভায় ঘোষণা করেছেন যে জানুয়ারির মধ্যেই হাদি হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ডদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে। হাদির স্মরণে ঝালকাঠির নলছিটি লঞ্চঘাটের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদি লঞ্চঘাট’ রাখা হয়েছে, যা এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক গুরুত্বই ফুটিয়ে তোলে।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ ও রাষ্ট্রীয় শোক
বাংলাদেশের রাজনীতির এক মহীরুহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং ৩১ ডিসেম্বর সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ৩১ ডিসেম্বর বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়। তাঁর এই প্রয়াণ শুধু দল নয়, সারা দেশের মানুষের মাঝে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
মায়ের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ লন্ডন থেকে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে বরণ করে নিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে যে উদ্দীপনা দেখা গিয়েছিল, তা খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আরও সংহত হয়েছে। তারেক রহমান জানিয়েছেন যে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি এখন নির্বাচনের দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ.এম.এম নাসির উদ্দিন ইতিমধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। একই দিনে ‘জুলাই চার্টার’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর একটি গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। তবে রাজপথের দাবি এখন ওসমান হাদি এবং এনসিপি নেতা মোতালেব শিকদারের ওপর হামলার বিচার নিশ্চিত করা। ইনকিলাব মঞ্চ ২০২৬ সালের প্রথম সপ্তাহকে ‘ইনকিলাব সপ্তাহ’ হিসেবে ঘোষণা করে খুনিদের বিচার দাবি করছে। যদি সরকার দ্রুত এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে না পারে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ধারার সাথে ছাত্র শক্তির সমন্বয় না ঘটে, তবে আসন্ন নির্বাচন ও গণতন্ত্র উত্তরণের পথ আরও বন্ধুর হয়ে উঠতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 
























