ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বছরের পর বছর ধরে লোকসানের বৃত্তে আটকে থাকলেও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক লোকসান এক লাফে প্রায় ৪৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় এই অস্বাভাবিক লোকসানকে সন্দেহের চোখে দেখছে এবং দ্রুত এর কারণ দর্শানোর ব্যাখ্যা তলব করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উচ্চ সুদে ব্যাংক ঋণ, ক্রয় ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য ভর্তুকি দেওয়ার কথা বলা হলেও টিসিবির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও জোরালো হচ্ছে।
সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবি এখন লোকসানের এক বিশাল পাহাড়ে চাপা পড়েছে। ধারাবাহিক লোকসানের পথ ধরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাকে ‘অস্বাভাবিক’ ও ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মনে করছে সরকারের নীতিনির্ধারক মহল।
তথ্যমতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিসিবির লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৪০৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই লোকসান বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে লোকসান বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ বা ৪৬০ শতাংশ। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, প্রতি বছর বাজেট থেকে টিসিবিকে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়া হলেও সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার হার খুবই নগণ্য। সংস্থাটি বাজার দরের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রির যুক্তি দিলেও আট হাজার কোটি টাকার লোকসানকে যৌক্তিক মনে করছে না অর্থ বিভাগ।
‘অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫’ অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরেই টিসিবির লোকসান জ্যামিতিক হারে বাড়ছে:
- ২০১৯-২০: ১৮৬ কোটি টাকা।
- ২০২০-২১: ৩০২ কোটি টাকা।
- ২০২১-২২: ৮৫৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
- ২০২২-২৩: ১ হাজার ১৩ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
- ২০২৩-২৪: ১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা।
- ২০২৪-২৫: ৭ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা (সংশোধিত হিসাব)।
অথচ টিসিবির ইতিহাস সবসময় লোকসানি ছিল না। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে মুনাফা করেছিল। এমনকি ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও তারা ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা লাভ করে। হঠাৎ করে এই বিশাল অংকের লোকসানের নেপথ্যে কেবল পণ্য ভর্তুকি নয়, বরং ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি ও অনিয়মকে দায়ী করা হচ্ছে। সিএজি-র এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও ইতিপূর্বে ২৯৭ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
টিসিবির পক্ষ থেকে উচ্চ সুদহারে ব্যাংক ঋণ এবং সয়াবিন তেলসহ নিত্যপণ্য ক্রয়ে অতিরিক্ত খরচকে লোকসানের কারণ হিসেবে দেখানো হলেও অর্থ বিভাগ এতে সন্তুষ্ট নয়। সংস্থাটি কেন হঠাৎ এত বেশি লোকসান করল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
রিপোর্টারের নাম 























