নোয়াখালীর হাতিয়ায় হত্যা মামলার বাদীকে থানায় জোর করে আটকে রেখে হত্যার ভয় দেখিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের নাম আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নিরপরাধদের নাম দিয়ে এজাহার সই করানোর অভিযোগ উঠেছে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ২৩ ডিসেম্বর হাতিয়ার সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চরে ঘটে যাওয়া সংঘর্ষ এবং গোলাগুলিতে ছয় জনের নিহত হওয়াকে কেন্দ্র করে হাতিয়া থানায় দায়ের হওয়া পৃথক দুটি হত্যা মামলায় মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে মামলা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তিনি মনগড়াভাবে আসামির তালিকা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পৃথকভাবে দায়ের হওয়া মামলা দুটির বাদীই এসব অভিযোগ এনে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
জানা যায়, ২৩ ডিসেম্বর হাতিয়া উপজেলার সুখচর ইউনিয়নের জাগলার চরে দিনভর চরের ভূমি দখল ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী আলাউদ্দিন বাহিনী, কোপা শামছু বাহিনী ও ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ফরিদ কমান্ডার বাহিনীর সদস্যরা পালিয়ে গেলেও আলাউদ্দিন বাহিনীর প্রধান আলাউদ্দিন, কোপা শামছু বাহিনীর প্রধান কোপা শামছু, কোপা শামছুর ছেলে মোবারক হোসেন শিহাবসহ ছয় জন নিহত হয়।
এ ঘটনায় ২৫ ডিসেম্বর নিহত কোপা শামছুর ভাই আবুল বাসার বাদী হয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ ও ১০-১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে হাতিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই ঘটনায় ২৬ ডিসেম্বর নিহত আলাউদ্দিনের বাবা মহি উদ্দিন বাদী হয়ে ২১ জনের নাম উল্লেখ করে ও ৪০-৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একই থানায় আরও একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহার দায়েরের সময় হত্যা মামলা দুটিতেই জোর করে আসামি পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ মামলা দুটির বাদী আবুল বাসার ও মহি উদ্দিনের।
নিহত আলাউদ্দিনের বাবা মহি উদ্দিনের অভিযোগ, ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে হত্যার ঘটনায় হাতিয়া থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা জোর করে তাকে থানায় ওসির কক্ষের পাশের একটি কক্ষে আটক করে রাখেন। এ সময় তাকে পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত একটি এজাহারে সই করতে বললে তিনি অপরাগতা জানান। সই না দেওয়ায় তাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই কক্ষে তালা লাগিয়ে আটক রাখা হয় এবং সই না করলে তাকেও হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে প্রাণভয়ে তিনি এজাহারে সই করেন বলেও অভিযোগ করেন।
এজাহারে অভিযুক্ত আসামিদের অনেকেই নিরপরাধ এবং এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এজাহারে ওসি তার ইচ্ছেমতো নাম বাসইছেন। আমি অনেক আসামির নাম নিজেই নতুন শুনতেছি।’
অপর মামলার বাদী নিহত কোপা শামছুর ভাই আবুল বাসার বলেন, ‘আমি মামলার বাদী হয়ে এজাহারে যাদের নাম উল্লেখ করেছি, থানার লোকজন সেসব নাম দেখে সেই এজাহার পরিবর্তন করে নতুন করে এজাহার লিখে আমার কাছ থেকে জোর করে সই নেন। বর্তমান এজাহারে থাকা আসামিদের অনেককেই আমি নিজেও চিনি না। আমার ভাইকে হারিয়েছি। আমরা এর ন্যায়বিচার চাই। তবে, আমার ভাইকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার না করে যদি নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হয় সেটা মেনে নেবো না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জাগলার চরে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা হয়েছে। দুটি মামলার বাদী এখন আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ করছেন সেগুলো শতভাগ মিথ্যা। তারা কেন, কীভাবে এগুলো বলছে তার কোনও কিছুই আমি জানি না। এ বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্যও করতে চাই না। আমি যেটা বলতে চাই, তারা স্বাধীনভাবে তাদের নিজের ইচ্ছেমতো এজাহার দিয়েছে। এখন তারা কেন, কী কারণে এগুলো বলছে তা আমি জানি না।’
থানায় আটক করে মামলার বাদীকে হত্যার ভয় দেখিয়ে এজাহারে সইয়ের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘থানার পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের ওপর কোনও প্রেশার ছিল না। আমরা তাদের বলেছি, তারা যেন নিরপেক্ষভাবে নিজেদের ইচ্ছায় এজাহার দেয়। থানার বাইরে এই ঘটনাসংক্রান্ত কী আছে না আছে তা আমি জানি না।’
জানতে চাইলে নোয়াখালীর পুলিশ সুপার টি এম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি মৌখিক অভিযোগ শুনেছি। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগের একটি অনুলিপি পেয়েছি। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি।’
রিপোর্টারের নাম 

























