ঢাকা ০৬:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ: সিপিডি’র মতে, ঘুরে দাঁড়াতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন

গতকাল ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক বিশেষজ্ঞ আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রফতানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন তীব্র চাপের মুখে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

সিপিডি ও একটি জাতীয় দৈনিকের যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, পুনরুদ্ধারের আভাস সীমিত:
ড. ফাহমিদা খাতুন তার প্রবন্ধে জানান, ২০২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি হ্রাস এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এর অন্যতম কারণ। তবে, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪.৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীর গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, এটিকে এখনো টেকসই পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।

চড়া মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয় সংকুচিত:
গত দুই বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৮.৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সামান্য উন্নতি হলেও, একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার (জানুয়ারিতে ৮.১২ শতাংশ) মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমালেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণপ্রবাহে মন্দা:
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৬.১০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন। উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বাজারে আস্থার অভাব এর পেছনে প্রধান কারণ। অন্যদিকে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় সরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২.১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে।

রাজস্ব দুর্বল, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি:
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৭৮ শতাংশ এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৭.৮১ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে সরকারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮.৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে বক্তারা মত দেন।

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বহাল:
ব্যাংকিং খাতে কিছু তারল্য সূচকে উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতি চালুর পর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। যদিও ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।

রফতানিতে ভাটা, রেমিট্যান্সে স্বস্তি:
২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কমেছে, যার প্রধান কারণ তৈরি পোশাক খাতে মন্থরতা। তবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় ২১.৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও জোরদার করতে পারে।

এলডিসি উত্তরণ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে বাজার সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।

সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই:
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো নাজুক। তাই এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বড় ও গভীর সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

তদবিরের অভিযোগ তুলে হত্যা মামলার রায় স্থগিত রাখলেন বিচারক

অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ: সিপিডি’র মতে, ঘুরে দাঁড়াতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন

আপডেট সময় : ০৪:৪৮:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬

গতকাল ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক বিশেষজ্ঞ আলোচনা সভায় দেশের বর্তমান অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রফতানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন তীব্র চাপের মুখে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

সিপিডি ও একটি জাতীয় দৈনিকের যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা তাদের মতামত তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি, পুনরুদ্ধারের আভাস সীমিত:
ড. ফাহমিদা খাতুন তার প্রবন্ধে জানান, ২০২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি হ্রাস এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এর অন্যতম কারণ। তবে, ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪.৫০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীর গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও, এটিকে এখনো টেকসই পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।

চড়া মূল্যস্ফীতি, প্রকৃত আয় সংকুচিত:
গত দুই বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৮.৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সামান্য উন্নতি হলেও, একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার (জানুয়ারিতে ৮.১২ শতাংশ) মূল্যস্ফীতির নিচে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমালেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

বিনিয়োগে স্থবিরতা, ঋণপ্রবাহে মন্দা:
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৬.১০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী নন। উচ্চ সুদহার, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বাজারে আস্থার অভাব এর পেছনে প্রধান কারণ। অন্যদিকে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়ায় সরকারি ঋণপ্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩২.১৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত করতে পারে।

রাজস্ব দুর্বল, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি:
২০২৫ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৭৮ শতাংশ এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৭.৮১ শতাংশে নেমে এসেছে। এতে সরকারের ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। মোট ঋণ-জিডিপি অনুপাত বেড়ে ৩৮.৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যদিও ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতে রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি বলে বক্তারা মত দেন।

ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি বহাল:
ব্যাংকিং খাতে কিছু তারল্য সূচকে উন্নতি হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতি চালুর পর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। যদিও ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছুটা কমানো সম্ভব হয়েছে, তবে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না বলে সতর্ক করা হয়েছে।

রফতানিতে ভাটা, রেমিট্যান্সে স্বস্তি:
২০২৬ অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.৯৩ শতাংশ কমেছে, যার প্রধান কারণ তৈরি পোশাক খাতে মন্থরতা। তবে, রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। একই সময়ে প্রবাসী আয় ২১.৭৬ শতাংশ বেড়ে ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহকে আরও জোরদার করতে পারে।

এলডিসি উত্তরণ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে বাজার সুবিধা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি।

সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই:
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং এলডিসি-পরবর্তী কৌশল প্রণয়ন—এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। তাদের মতে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক আভাস থাকলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এখনো নাজুক। তাই এই সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে বড় ও গভীর সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।