নারীর অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের স্বীকৃতি এবং দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করতে তরুণদের, বিশেষত পুরুষদের, সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ)। সংগঠনটির উদ্যোগে ‘সময় এসেছে পরিবর্তনের: অবৈতনিক পরিচর্যা-সংস্কৃতি রূপান্তরে তরুণদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা থেকে এই জরুরি বার্তা উঠে আসে। গত বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
আয়োজকদের মতে, সামাজিক ধ্যানধারণা ও পারিবারিক দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে নারীরা এখনও অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজে পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি সময় ব্যয় করেন, যা তাদের শিক্ষা, আয়মুখী কাজ ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রায় ৩৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের বেশি। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই বৈষম্য দূর না হলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনূ রাব্বানি বলেন, “বিয়ে বা প্রথম সন্তান হওয়ার আগে শ্রমবাজারে নারী ও পুরুষের আয়ে তেমন পার্থক্য থাকে না। তবে সন্তান হওয়ার পর চিত্র বদলে যায়, যা বিশ্বজুড়েই এক সাধারণ প্রবণতা। ডেনমার্কে প্রথম সন্তান জন্মের পাঁচ বছর পর স্বামী-স্ত্রীর আয়ের পার্থক্য দাঁড়ায় ২৯ শতাংশ; সুইডেনে এ হার প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই বৈষম্য আরও প্রকট।” তিনি আরও বলেন, পরিবারে সন্তানের পেছনে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলে জৈবিক ও সামাজিক কারণে নারীদেরই শ্রমবাজার থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরে আসতে হয়। পুরুষ কর্মীদেরও দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে, ফলে পরিবারে কাজের সুষম বণ্টন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নারীরাই কর্মক্ষেত্র থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। অধ্যাপক রাব্বানি মনে করেন, শুধু সচেতনতা বা মানসিকতার পরিবর্তন দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আইআরবিডি কোঅর্ডিনেটর তাওফিকুল ইসলাম খান বলেন, “নীতি প্রণয়নের আগে মানুষের চাহিদা বোঝা জরুরি। যেসব দেশে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশের বেশি, সেসব দেশ উন্নয়নে এগিয়ে। বাংলাদেশে এ হার প্রায় ৩৫ শতাংশ; তা বাড়াতে না পারলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহি গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদান ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ‘ছেলেরা বাইরে কাজ করবে আর মেয়েরা ঘরে’—এই ধারণা সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। এ জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে মিডিয়ার ভূমিকা জরুরি।”
কর্মসূচিতে সৃজনশীল মাইম পরিবেশনা, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, উন্মুক্ত সংলাপ, আলোকচিত্র ও শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ, গবেষক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও শিল্পীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
আয়োজকরা জানান, তরুণদের—বিশেষ করে তরুণ পুরুষদের—সক্রিয় সম্পৃক্ততার মাধ্যমে গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজকে যৌথ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এর মধ্য দিয়ে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রিপোর্টারের নাম 



















