দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ, জ্বালানি সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যবস্থায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, বিদায়ী ২০২৫ সালটি ছিল মূলত টিকে থাকার লড়াইয়ের বছর। গত এক বছরে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৩৫ শতাংশ বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পণ্যের বিক্রি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে অনেক কারখানা তাদের উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার করতে পারছে না, ফলে অনেক উদ্যোক্তা শিফট কমাতে বা ইউনিট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতি এবং ১৪-১৬ শতাংশ উচ্চ সুদহার নতুন বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ শতাংশে, যা অর্থনীতির নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিশেষ করে সিএমএসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। এছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার হারও ২০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী শিল্প স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।
রপ্তানি খাতেও দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির প্রভাব এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমায় টানা চার মাস ধরে পণ্য রপ্তানি কমছে। বিজিএমইএ এবং এফবিসিসিআই নেতাদের মতে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শ্রমিক অসন্তোষ এবং বন্দরে লজিস্টিক অব্যবস্থাপনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। তবে এতো নেতিবাচক পরিস্থিতির মাঝেও ২০২৬ সালকে ‘ঘুরে দাঁড়ানোর বছর’ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক রোডম্যাপ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরবে—এমন প্রত্যাশায় বুক বাঁধছেন তাঁরা।
অর্থনীতিবিদ ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সংস্কারের সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নে গতি কম। বেসরকারি বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। নতুন বছরে ব্যবসায়ীদের প্রধান প্রত্যাশা হলো, নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা দূর করা এবং জ্বালানি সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। লজিস্টিক ব্যয় কমানো এবং এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমেই কেবল এই গুমোট ভাব কাটিয়ে অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করা সম্ভব।
রিপোর্টারের নাম 

























