ঢাকা ১২:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঐতিহাসিক সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে দারুল উলুম দেওবন্দ সফর করলেন তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পেলেন উষ্ণ অভ্যর্থনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২৫:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫
  • ৪১ বার পড়া হয়েছে

ভারত এখনও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিলেও, আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

গত ১০ অক্টোবর আমির খান মুত্তাকি দিল্লিতে নামার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সাক্ষাতের পর তিনি ঘোষণা দেন যে, কাবুলে অবস্থিত ভারতের ‘টেকনিক্যাল মিশন’কে পূর্ণ দূতাবাসের মর্যাদা দেওয়া হবে।

এরপর ১১ অক্টোবর তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এশিয়ার সুপ্রসিদ্ধ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ সফর করেন। সেখানেও তাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

দীর্ঘদিন আফগানিস্তানে অবস্থান করা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হক বলেন, “দেওবন্দে আমির খান মুত্তাকিকে খুবই আন্তরিক ও স্বাগতপূর্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার আগমনের সময় ঘটনাস্থলে এত ভিড় ছিল যে, সেখানে কোনো প্রটোকল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।”

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই দেওবন্দ সফরকে ‘শানদার সফর’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখানে শুধু দেওবন্দ থেকেই নয়, বরং গোটা এলাকার অসংখ্য মানুষ এসেছেন। তাদের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তার জন্য আমি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আমি দেওবন্দের ওলামায়ে কেরাম ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি ভারত ও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক খুবই উজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছি।”

এ সময় নিজের বক্তৃতায় তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি আরও বলেন, “দেওবন্দের সঙ্গে আমাদের শুধু ধর্মীয়ই নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।”

তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জাকির জালালি বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে ঐতিহাসিক এই সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। এ সম্পর্কের মাধ্যমে শুধু ইলমি সহযোগিতাই বৃদ্ধি পাবে না, বরং এ অঞ্চলে ধর্মীয় শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং সংযমের পরিবেশ শক্তিশালী করার পথও প্রশস্ত হবে।”

অনেক তালেবান সমর্থক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির দেওবন্দ সফরের প্রশংসা করেছেন। তালেবান আন্দোলনকে সমর্থনকারী লেখক আবদুস সাত্তার সাঈদ লিখেছেন, “এই অভ্যর্থনা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা কিংবা প্রতীকী ছিল না, বরং এতে আন্তরিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ঝলক দেখা গেছে।”

প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হক বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারার সঙ্গে আফগান তালেবানের সম্পর্ক রয়েছে এবং তালেবানের বেশকিছু নেতাও এই একই চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেওবন্দের হাদিসের দরসে (ক্লাস) বসেন এবং সেখানে তাকে সম্মানসূচক পাগড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়।”

আমির খান মুত্তাকি দেওবন্দে আসার আগে মাদ্রাসাটির সদরুল মুদাররিসিন (প্রিন্সিপাল) ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেন, “হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য দেওবন্দের ওলামায়ে কেরাম যা যা করেছেন, আফগানিস্তান তাদের থেকেই শিখেছে।”

মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেন, “যেভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিলেন, একইভাবে আফগানিস্তানে তালেবানও বর্তমান সময়ের সর্বাধিক প্রভাবশালী দুই শক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত করেছে। আর এটিই সেই শক্তি, যা আজ তাদের দেওবন্দ নিয়ে এসেছে।”

দারুল উলুম দেওবন্দে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমোদিত মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “আমরা আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে দুটি সেশন রেখেছিলাম– একটি বিশেষ সাক্ষাৎ পর্ব এবং আরেকটি সাধারণ সভা। কিন্তু ভিড় এত বেশি ছিল যে, নিরাপত্তার কারণে সাধারণ সভা স্থগিত করতে বাধ্য হতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিশেষ সাক্ষাৎ পর্বটি খুব দারুণ ছিল। আমির খান মুত্তাকি মাওলানা আরশাদ মাদানি ও দারুল উলুমের মুহতামিম (ভিসি) মুফতি আবুল কাসেম নোমানির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় আফগান মন্ত্রী তাদের হাদিসের দরসে বসেন এবং হাদিস বর্ণনার ‘ইজাজতপ্রাপ্ত’ হন। এটি এমন একটি প্রতীকী সম্মান, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, আমির খান মুত্তাকি মুফতি আবুল কাসেম নোমানির হাদিসের শাগরিদ ও ছাত্র।”

আমির খান মুত্তাকির এই সফর দেওবন্দের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “তিনি আমাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলেন এবং সেই হিসেবেই আমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছি। দারুল উলুম দেওবন্দ রাষ্ট্রের বাইরের কিছু নয়। দেওবন্দ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেই আছে। যদি (এর মাধ্যমে) দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো হয়, তাহলে উভয়ের জন্যই এটি একটি স্বাগত জানানোর মতো ব্যাপার হবে।”

আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের পর দেশটির ছাত্ররা কি এখানে পড়তে আসবেন—এমন প্রশ্ন করলে মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে এখনও অনেক আফগান শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।”

দেওবন্দ ও তালেবান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, “আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর শুধু দেওবন্দের জন্যই নয়, বরং গোটা ভারতের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যদি আপনি পেছনে ফিরে তাকান, তাহলে দেখবেন উভয়ে একসময় অভিন্ন রাষ্ট্রই ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “যখন ইংরেজদের বিপক্ষে শাইখুল হিন্দের আন্দোলন চলছিল, তখন আফগান অঞ্চলের অনেক ওলামায়ে কেরাম তার সঙ্গে আন্দোলনে শরীক ছিলেন। এই সম্পর্ক সোয়া শ’ থেকে দেড় শ’ বছরের পুরনো, যা এখনও জারি রয়েছে।”

মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, স্বাধীনতার পর, ১৯৫৮ সালে আফগানিস্তানের বাদশাহ মোহাম্মদ জহির শাহ যখন ভারত সফর করেন, তখন প্রথম প্রেসিডেন্ট ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সফরে আফগান বাদশাহ দারুল উলুম দেওবন্দেও আগমন করেন এবং এখানে তার নামে ‘বাবুজ জহির’ নামে চমৎকার একটি ফটক নির্মাণ করা হয়। এই ফটকের সমস্ত খরচ আফগান সরকার বহন করে।

মাওলানা কান্ধলভী আরও বলেন, ওই সময় দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম কারী মোহাম্মদ তায়্যিব সাহেবও আফগানিস্তান সফর করেন এবং তাকেও সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।

মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, ভারত ভাগের সময় দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক ও শাইখুল হাদিস মাওলানা আব্দুল হক নিজ মাতৃভূমি খাইবার পাখতুনখোয়াতে (পাকিস্তানের একটি রাজ্য) বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে গিয়ে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে দারুল উলুম হক্কানিয়া নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদ্রাসাটি খাইবার পাখতুনখোয়ার আকোরা খট্টকে অবস্থিত, যা পরে তালেবানের শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে তালেবান আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর, তালেবানের একাধিক সিনিয়র নেতা জালালুদ্দিন হক্কানি, শেখ আব্দুল হাকিমসহ আন্দোলনের বেশিরভাগ নেতা এই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।

দারুল উলুম হক্কানিয়ায় পড়ুয়া মৌলভি আব্দুল গনি বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে এই মাদ্রাসার গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আফগানদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাশাপাশি দারুল উলুম হক্কানিয়াকে বিবেচনা করা হয় দেওবন্দের অন্যতম একটি শাখা হিসেবে। আসলে দেওবন্দ আমাদের কাছে শুধু একটি মাদ্রাসাই নয়, বরং একটি চেতনা ও চিন্তাধারার নাম।”

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির এই সফর দেওবন্দের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, “তার আগমনে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই বার্তা যাবে যে, দেওবন্দ মাদ্রাসা এবং দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষত মুসলিম বিশ্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এরপর আফগান শিক্ষার্থীরাও খুব সহজে দেওবন্দ আসতে পারবেন।”

আমির খান মুত্তাকিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি দেওবন্দেই কেন সফরে যাবেন। জবাবে তিনি বলেন, “কেউ মাদ্রাসায় কেন যায়? স্পষ্ট হলো, পড়াশোনার জন্য। যেভাবে আফগান শিক্ষার্থীরা ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিক্যালে পড়তে আসে, ঠিক তেমনই ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের জন্য তারা দারুল উলুম দেওবন্দকে পছন্দ করে।”

প্রফেসর মাজহারুল হক জানান, ভারতে আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তিনি এই সফরে আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে দেখেছেন। দেওবন্দ সফরকালেও সাবেক রাষ্ট্রদূত মুত্তাকির পাশেই ছিলেন। এর থেকেই অনুমান করা যায়, খুব শিগগিরই ভারতে অবস্থিত আফগান দূতাবাস চালু হতে পারে।

প্রফেসর মাজহারুল হক বলেন, “যদিও এখন পর্যন্ত ভারত সরকার ও তালেবান সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, কিন্তু ব্যাক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে তাদের মধ্যে আলোচনা জারি রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা তো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ ও বিপ্লবোত্তর সাহিত্য: বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব থেকে মুক্তির সন্ধানে

ঐতিহাসিক সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে দারুল উলুম দেওবন্দ সফর করলেন তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পেলেন উষ্ণ অভ্যর্থনা

আপডেট সময় : ০৪:২৫:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫

ভারত এখনও আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিলেও, আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির ভারত সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।

গত ১০ অক্টোবর আমির খান মুত্তাকি দিল্লিতে নামার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। সাক্ষাতের পর তিনি ঘোষণা দেন যে, কাবুলে অবস্থিত ভারতের ‘টেকনিক্যাল মিশন’কে পূর্ণ দূতাবাসের মর্যাদা দেওয়া হবে।

এরপর ১১ অক্টোবর তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এশিয়ার সুপ্রসিদ্ধ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ সফর করেন। সেখানেও তাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়।

দীর্ঘদিন আফগানিস্তানে অবস্থান করা জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হক বলেন, “দেওবন্দে আমির খান মুত্তাকিকে খুবই আন্তরিক ও স্বাগতপূর্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তার আগমনের সময় ঘটনাস্থলে এত ভিড় ছিল যে, সেখানে কোনো প্রটোকল রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।”

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই দেওবন্দ সফরকে ‘শানদার সফর’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “এখানে শুধু দেওবন্দ থেকেই নয়, বরং গোটা এলাকার অসংখ্য মানুষ এসেছেন। তাদের এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিকতাপূর্ণ আতিথেয়তার জন্য আমি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। আমি দেওবন্দের ওলামায়ে কেরাম ও এলাকাবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি ভারত ও আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক খুবই উজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছি।”

এ সময় নিজের বক্তৃতায় তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি আরও বলেন, “দেওবন্দের সঙ্গে আমাদের শুধু ধর্মীয়ই নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।”

তালেবান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা জাকির জালালি বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে ঐতিহাসিক এই সম্পর্কের মাধ্যমে দুই দেশের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে পারে। এ সম্পর্কের মাধ্যমে শুধু ইলমি সহযোগিতাই বৃদ্ধি পাবে না, বরং এ অঞ্চলে ধর্মীয় শ্রদ্ধা, পারস্পরিক সম্মান, বোঝাপড়া এবং সংযমের পরিবেশ শক্তিশালী করার পথও প্রশস্ত হবে।”

অনেক তালেবান সমর্থক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির দেওবন্দ সফরের প্রশংসা করেছেন। তালেবান আন্দোলনকে সমর্থনকারী লেখক আবদুস সাত্তার সাঈদ লিখেছেন, “এই অভ্যর্থনা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা কিংবা প্রতীকী ছিল না, বরং এতে আন্তরিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ঝলক দেখা গেছে।”

প্রফেসর মোহাম্মদ মাজহারুল হক বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের চিন্তাধারার সঙ্গে আফগান তালেবানের সম্পর্ক রয়েছে এবং তালেবানের বেশকিছু নেতাও এই একই চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।”

তিনি আরও বলেন, “আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেওবন্দের হাদিসের দরসে (ক্লাস) বসেন এবং সেখানে তাকে সম্মানসূচক পাগড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়।”

আমির খান মুত্তাকি দেওবন্দে আসার আগে মাদ্রাসাটির সদরুল মুদাররিসিন (প্রিন্সিপাল) ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেন, “হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য দেওবন্দের ওলামায়ে কেরাম যা যা করেছেন, আফগানিস্তান তাদের থেকেই শিখেছে।”

মাওলানা আরশাদ মাদানি বলেন, “যেভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিলেন, একইভাবে আফগানিস্তানে তালেবানও বর্তমান সময়ের সর্বাধিক প্রভাবশালী দুই শক্তি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত করেছে। আর এটিই সেই শক্তি, যা আজ তাদের দেওবন্দ নিয়ে এসেছে।”

দারুল উলুম দেওবন্দে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমোদিত মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “আমরা আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে দুটি সেশন রেখেছিলাম– একটি বিশেষ সাক্ষাৎ পর্ব এবং আরেকটি সাধারণ সভা। কিন্তু ভিড় এত বেশি ছিল যে, নিরাপত্তার কারণে সাধারণ সভা স্থগিত করতে বাধ্য হতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিশেষ সাক্ষাৎ পর্বটি খুব দারুণ ছিল। আমির খান মুত্তাকি মাওলানা আরশাদ মাদানি ও দারুল উলুমের মুহতামিম (ভিসি) মুফতি আবুল কাসেম নোমানির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় আফগান মন্ত্রী তাদের হাদিসের দরসে বসেন এবং হাদিস বর্ণনার ‘ইজাজতপ্রাপ্ত’ হন। এটি এমন একটি প্রতীকী সম্মান, যার মাধ্যমে বোঝা যায়, আমির খান মুত্তাকি মুফতি আবুল কাসেম নোমানির হাদিসের শাগরিদ ও ছাত্র।”

আমির খান মুত্তাকির এই সফর দেওবন্দের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “তিনি আমাদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ছিলেন এবং সেই হিসেবেই আমরা তাকে স্বাগত জানিয়েছি। দারুল উলুম দেওবন্দ রাষ্ট্রের বাইরের কিছু নয়। দেওবন্দ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেই আছে। যদি (এর মাধ্যমে) দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো হয়, তাহলে উভয়ের জন্যই এটি একটি স্বাগত জানানোর মতো ব্যাপার হবে।”

আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরের পর দেশটির ছাত্ররা কি এখানে পড়তে আসবেন—এমন প্রশ্ন করলে মাওলানা আশরাফ উসমানি বলেন, “এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে এখনও অনেক আফগান শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত।”

দেওবন্দ ও তালেবান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও ইতিহাসবিদ মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, “আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর শুধু দেওবন্দের জন্যই নয়, বরং গোটা ভারতের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যদি আপনি পেছনে ফিরে তাকান, তাহলে দেখবেন উভয়ে একসময় অভিন্ন রাষ্ট্রই ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “যখন ইংরেজদের বিপক্ষে শাইখুল হিন্দের আন্দোলন চলছিল, তখন আফগান অঞ্চলের অনেক ওলামায়ে কেরাম তার সঙ্গে আন্দোলনে শরীক ছিলেন। এই সম্পর্ক সোয়া শ’ থেকে দেড় শ’ বছরের পুরনো, যা এখনও জারি রয়েছে।”

মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, স্বাধীনতার পর, ১৯৫৮ সালে আফগানিস্তানের বাদশাহ মোহাম্মদ জহির শাহ যখন ভারত সফর করেন, তখন প্রথম প্রেসিডেন্ট ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তাকে অভ্যর্থনা জানান। এ সফরে আফগান বাদশাহ দারুল উলুম দেওবন্দেও আগমন করেন এবং এখানে তার নামে ‘বাবুজ জহির’ নামে চমৎকার একটি ফটক নির্মাণ করা হয়। এই ফটকের সমস্ত খরচ আফগান সরকার বহন করে।

মাওলানা কান্ধলভী আরও বলেন, ওই সময় দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম কারী মোহাম্মদ তায়্যিব সাহেবও আফগানিস্তান সফর করেন এবং তাকেও সেখানে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।

মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, ভারত ভাগের সময় দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক ও শাইখুল হাদিস মাওলানা আব্দুল হক নিজ মাতৃভূমি খাইবার পাখতুনখোয়াতে (পাকিস্তানের একটি রাজ্য) বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে গিয়ে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে দারুল উলুম হক্কানিয়া নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাদ্রাসাটি খাইবার পাখতুনখোয়ার আকোরা খট্টকে অবস্থিত, যা পরে তালেবানের শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানে তালেবান আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা ওমর, তালেবানের একাধিক সিনিয়র নেতা জালালুদ্দিন হক্কানি, শেখ আব্দুল হাকিমসহ আন্দোলনের বেশিরভাগ নেতা এই মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।

দারুল উলুম হক্কানিয়ায় পড়ুয়া মৌলভি আব্দুল গনি বলেন, “দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে এই মাদ্রাসার গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানটি আফগানদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাশাপাশি দারুল উলুম হক্কানিয়াকে বিবেচনা করা হয় দেওবন্দের অন্যতম একটি শাখা হিসেবে। আসলে দেওবন্দ আমাদের কাছে শুধু একটি মাদ্রাসাই নয়, বরং একটি চেতনা ও চিন্তাধারার নাম।”

তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির এই সফর দেওবন্দের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে মাওলানা নুরুল হাসান রশিদ কান্ধলভী বলেন, “তার আগমনে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই বার্তা যাবে যে, দেওবন্দ মাদ্রাসা এবং দেওবন্দি ওলামায়ে কেরাম হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য অনেক বড় ভূমিকা রেখেছেন এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে বিশেষত মুসলিম বিশ্বে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি এরপর আফগান শিক্ষার্থীরাও খুব সহজে দেওবন্দ আসতে পারবেন।”

আমির খান মুত্তাকিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি দেওবন্দেই কেন সফরে যাবেন। জবাবে তিনি বলেন, “কেউ মাদ্রাসায় কেন যায়? স্পষ্ট হলো, পড়াশোনার জন্য। যেভাবে আফগান শিক্ষার্থীরা ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিক্যালে পড়তে আসে, ঠিক তেমনই ধর্মীয় শিক্ষা অর্জনের জন্য তারা দারুল উলুম দেওবন্দকে পছন্দ করে।”

প্রফেসর মাজহারুল হক জানান, ভারতে আফগানিস্তানের সাবেক সরকারের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তিনি এই সফরে আমির খান মুত্তাকির সঙ্গে দেখেছেন। দেওবন্দ সফরকালেও সাবেক রাষ্ট্রদূত মুত্তাকির পাশেই ছিলেন। এর থেকেই অনুমান করা যায়, খুব শিগগিরই ভারতে অবস্থিত আফগান দূতাবাস চালু হতে পারে।

প্রফেসর মাজহারুল হক বলেন, “যদিও এখন পর্যন্ত ভারত সরকার ও তালেবান সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, কিন্তু ব্যাক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে তাদের মধ্যে আলোচনা জারি রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা তো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো।”