ঢাকা ০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সাংবাদিক দমনে ‘হাতিয়ার’ যখন সন্ত্রাসবিরোধী আইন: উদ্বেগ অ্যামনেস্টি ও আন্তর্জাতিক মহলের

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৭:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার একটি নতুন ও ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

সম্প্রতি সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রদানের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মতপ্রকাশের কারণে ব্যক্তিদের নিশানা করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তিনি টকশোতে আওয়ামী লীগকে পুনবার্সনের ‘গুজব’ ছড়িয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করেছেন। তবে আদালতে আনিস আলমগীর দাবি করেছেন, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কথা বলেননি বরং সাংবাদিক হিসেবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই তাঁর কাজ। বর্তমানে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শুধু আনিস আলমগীরই নন, জাতীয় প্রেসক্লাবের পাঁচবারের সভাপতি শওকত মাহমুদকেও একই আইনে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রবাসীদের সাথে মিলে অন্তর্বর্তী সরকার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন। এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সাংবাদিক মেহেদী হাসান এবং এর আগে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকেও এই আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ৩৫৪ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যা ইতিহাসের রেকর্ড। টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে ‘অশনি সংকেত’ অভিহিত করে বলেছেন, আগের সরকার সাইবার অ্যাক্ট ব্যবহার করতো, আর বর্তমান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

আইনজীবীদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন মূলত জঙ্গি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড দমনের জন্য প্রণীত হয়েছিল (২০০৯ সালে)। এই আইনের আওতায় মৃত্যু ঘটানোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এটি একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি বলেন, আনিস আলমগীর কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেননি বরং সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকীর দাবি, বক্তব্যের মাধ্যমে সন্ত্রাস উসকে দিলেও এই আইনের আওতায় বিচার সম্ভব। সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সরকার ব্রিটিশ আমলের ‘ডিটেনশন’ বা বিনা বিচারে আটকাদেশ প্রথাও ফিরিয়ে এনেছে, যা বিগত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতির ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

জগন্নাথের বেদখল হল উদ্ধারে সব ধরনের আইনি সহায়তার আশ্বাস এমপি হামিদের

সাংবাদিক দমনে ‘হাতিয়ার’ যখন সন্ত্রাসবিরোধী আইন: উদ্বেগ অ্যামনেস্টি ও আন্তর্জাতিক মহলের

আপডেট সময় : ০৩:৪৭:১৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার একটি নতুন ও ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

সম্প্রতি সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার এবং পাঁচ দিনের রিমান্ড প্রদানের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মতপ্রকাশের কারণে ব্যক্তিদের নিশানা করতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করা একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তিনি টকশোতে আওয়ামী লীগকে পুনবার্সনের ‘গুজব’ ছড়িয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করেছেন। তবে আদালতে আনিস আলমগীর দাবি করেছেন, তিনি কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কথা বলেননি বরং সাংবাদিক হিসেবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করাই তাঁর কাজ। বর্তমানে পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শুধু আনিস আলমগীরই নন, জাতীয় প্রেসক্লাবের পাঁচবারের সভাপতি শওকত মাহমুদকেও একই আইনে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রবাসীদের সাথে মিলে অন্তর্বর্তী সরকার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করছেন। এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সাংবাদিক মেহেদী হাসান এবং এর আগে সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাকেও এই আইনের আওতায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দেড় বছরে প্রায় ৩৫৪ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, যা ইতিহাসের রেকর্ড। টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে ‘অশনি সংকেত’ অভিহিত করে বলেছেন, আগের সরকার সাইবার অ্যাক্ট ব্যবহার করতো, আর বর্তমান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

আইনজীবীদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন মূলত জঙ্গি ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড দমনের জন্য প্রণীত হয়েছিল (২০০৯ সালে)। এই আইনের আওতায় মৃত্যু ঘটানোর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এটি একটি জামিন অযোগ্য অপরাধ। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি বলেন, আনিস আলমগীর কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেননি বরং সরকারকে সতর্ক করেছিলেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওমর ফারুক ফারুকীর দাবি, বক্তব্যের মাধ্যমে সন্ত্রাস উসকে দিলেও এই আইনের আওতায় বিচার সম্ভব। সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সরকার ব্রিটিশ আমলের ‘ডিটেনশন’ বা বিনা বিচারে আটকাদেশ প্রথাও ফিরিয়ে এনেছে, যা বিগত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। এই পরিস্থিতির ফলে দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা স্থায়ীভাবে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।