দীর্ঘদিনের জনদাবি, অংশীজনদের ধারাবাহিক পরামর্শ এবং বিশেষ করে রক্তক্ষয়ী জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে সূচিত রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কার্যত লোকদেখানো ও ফাঁকাবুলি ছাড়া কিছুই নয় বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি জানায়, জুলাই আন্দোলনে অবর্ণনীয় আত্মত্যাগের বিনিময়ে সামগ্রিক পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, এই অধ্যাদেশ তা বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে পদদলিত করেছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী গঠিত পুলিশ কমিশন স্বাধীন ও কার্যকর হওয়ার পরিবর্তে বাস্তবে সরকারের আজ্ঞাবহ অবসরপ্রাপ্ত ও প্রেষণে নিয়োজিত প্রশাসনিক ও পুলিশ আমলাদের কর্তৃত্বচর্চার আরেকটি প্রকল্পে পরিণত হবে, যা জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়।
গত ৯ ডিসেম্বর গেজেটভুক্ত অধ্যাদেশটিকে মৌলিক ধারণাগত, কৌশলগত ও কাঠামোগতভাবে গুরুতর ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এ অধ্যাদেশ পুলিশের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে পুলিশ বাহিনীর ওপর প্রশাসনিক ও পুলিশি আমলাতন্ত্র—বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও গভীরতর করবে।”
তিনি বলেন, “ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি ও বহুমাত্রিক অপরাধের কারণে পুলিশের ওপর যে জনআস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনের পরিবর্তে প্রস্তাবিত কমিশন সরকারের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে পুলিশের জবাবদিহিহীনতার বৈধতা দেওয়ার আরেকটি আয়োজন হয়ে উঠবে।”
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “যে পুলিশ কমিশনের জন্য জনগণ ও নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে, তার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হলো সরকারের প্রভাব থেকে কার্যকর স্বাধীনতা। অথচ অধ্যাদেশটিতে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি পর্যন্ত অনুপস্থিত।”
কমিশনের গঠনসংক্রান্ত বিধানগুলোতে স্পষ্ট স্বার্থসংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, “অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে সদস্য-সচিব করার বিধান কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে।” বিশ্বের কোথাও এ ধরনের কমিশনে নির্দিষ্ট শ্রেণির কর্মকর্তাদের এভাবে অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “প্রস্তাবিত কমিশনের সব কার্যক্রম ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যত আমলাতন্ত্র ও পুলিশের প্রভাবাধীন হয়ে পড়বে। অথচ আন্তর্জাতিক উত্তমচর্চা অনুযায়ী কমিশনের সচিব কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন, ভোটাধিকার ছাড়াই সভায় অংশ নিতে পারবেন।”
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, “অধ্যাদেশের ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘জননিরাপত্তা ও মানবাধিকার’-এর ভারসাম্যের কথা বলা হলেও ‘জননিরাপত্তা’র স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এটি বাস্তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বৈধতার সুযোগ তৈরি করবে। একইসঙ্গে এটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতাও খর্ব করতে পারে।”
এছাড়া নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও পুলিশ অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি—উভয় ক্ষেত্রেই কমিশনের সদস্যদের দিয়ে গঠনের বিধান স্বার্থসংঘাত সৃষ্টি করবে এবং অভিযোগের স্বাধীন ও ন্যায়সংগত নিষ্পত্তিকে অসম্ভব করে তুলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অধ্যাদেশের ২৩, ২৪ ও ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার অভাবের কারণে প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন কার্যত সরকারের একটি অধীনস্থ দপ্তরে পরিণত হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই কাঠামো বহাল থাকলে বাংলাদেশে প্রকৃত পুলিশ সংস্কারের সম্ভাবনা শূন্যে নেমে আসবে।”
বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের অভ্যন্তরে সংস্কারবিরোধী চক্রের কাছে নতজানু অবস্থান পরিহার করে অবিলম্বে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংশোধনের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানায় টিআইবি। যাতে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও জনআকাঙ্ক্ষাভিত্তিক পুলিশ কমিশন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।
রিপোর্টারের নাম 

























