ঢাকা ০৬:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

টাকা ছাপিয়ে নয়, প্রাকৃতিক উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে: গভর্নর

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গত কয়েক বছরে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ফলে আর্থিক খাত সংকুচিত হয়েছে। একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থাকলেও তা কমে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অর্থনীতিকে টেকসইভাবে বড় করতে হলে টাকা ছাপিয়ে নয়, প্রাকৃতিক ও বাস্তবভিত্তিক উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে।

সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) কক্সবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধনী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, “বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এর ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি না করে এমন উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।”

তিনি বলেন, “চীন, ভারত ও ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে মুদ্রা সরবরাহ এখনও অনেক কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিকল্প নেই।”

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে পারলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে এবং পুরো ব্যাংক খাত শক্তিশালী হবে। তা না হলে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি ব্যাংক বড় হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক খাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত টাকার সরবরাহ না থাকলে ব্যাংকগুলোর আমানতও বাড়বে না।”

তিনি আরও বলেন, “অতীতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা অর্থনীতিতে থাকলে আজকের সংকটের অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো। ধীরে ধীরে ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।”

ক্যাশলেস লেনদেন প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে ডিজিটাল লেনদেনের বিকল্প নেই। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক চায়, সবার হাতে স্মার্টফোন থাকুক।”

ব্যাংকগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, “ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে জোর দিতে হবে এবং ক্রেডিট কার্ডের সীমা বাড়াতে হবে। ফিনটেক ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যাংকে রূপ নেবে। এজন্য এখনই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের সভাপতিত্বে কক্সবাজারের সায়মন বিচ রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের পরিচালক রাফেজা আক্তার কান্তা এবং অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির। প্রবন্ধে ক্যাশলেস বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহিত করতে প্রণোদনার মাধ্যমে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কমানো বা সাময়িকভাবে ফ্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ক্যাশলেস প্রচারণার লিড পার্টনার এসএসএল কমার্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযোগী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) ও পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (পিএসও) মধ্যে মার্চেন্ট অ্যাকুইজিশনের স্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যটন এলাকায় ক্যাশলেস লেনদেনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ভ্যান, ছোট দোকান এমনকি সমুদ্রসৈকতে চেয়ার ভাড়াও ডিজিটালি পরিশোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এর আগে সোমবার সকালে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ক প্রচারপত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে দু’দিনব্যাপী এই কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঢাকার বাইরে ১১টি স্থানে ইতোমধ্যে ক্যাশলেস প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধে মার্কিনদের সমর্থন হ্রাস: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও তলানিতে

টাকা ছাপিয়ে নয়, প্রাকৃতিক উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে: গভর্নর

আপডেট সময় : ০৯:৪০:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, গত কয়েক বছরে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ফলে আর্থিক খাত সংকুচিত হয়েছে। একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার থাকলেও তা কমে ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। বর্তমানে রিজার্ভ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অর্থনীতিকে টেকসইভাবে বড় করতে হলে টাকা ছাপিয়ে নয়, প্রাকৃতিক ও বাস্তবভিত্তিক উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে হবে।

সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) কক্সবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে আয়োজিত ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধনী আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গভর্নর বলেন, “বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। এর ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি না করে এমন উপায়ে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।”

তিনি বলেন, “চীন, ভারত ও ভিয়েতনামসহ অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে মুদ্রা সরবরাহ এখনও অনেক কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো, বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিকল্প নেই।”

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে পারলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থনীতিতে টাকার প্রবাহ বাড়বে এবং পুরো ব্যাংক খাত শক্তিশালী হবে। তা না হলে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি ব্যাংক বড় হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক খাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল আসবে না। অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত টাকার সরবরাহ না থাকলে ব্যাংকগুলোর আমানতও বাড়বে না।”

তিনি আরও বলেন, “অতীতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা অর্থনীতিতে থাকলে আজকের সংকটের অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো। ধীরে ধীরে ও নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।”

ক্যাশলেস লেনদেন প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, “নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে ডিজিটাল লেনদেনের বিকল্প নেই। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক চায়, সবার হাতে স্মার্টফোন থাকুক।”

ব্যাংকগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, “ডেবিট কার্ডের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে জোর দিতে হবে এবং ক্রেডিট কার্ডের সীমা বাড়াতে হবে। ফিনটেক ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দেশের প্রচলিত ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে ডিজিটাল ব্যাংকে রূপ নেবে। এজন্য এখনই প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে হবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের সভাপতিত্বে কক্সবাজারের সায়মন বিচ রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের পরিচালক রাফেজা আক্তার কান্তা এবং অতিরিক্ত পরিচালক মো. পারওয়েজ আনজাম মুনির। প্রবন্ধে ক্যাশলেস বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ক্যাশলেস লেনদেন উৎসাহিত করতে প্রণোদনার মাধ্যমে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) কমানো বা সাময়িকভাবে ফ্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

ক্যাশলেস প্রচারণার লিড পার্টনার এসএসএল কমার্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের প্রতিযোগী নয়, বরং সহযোগী। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) ও পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (পিএসও) মধ্যে মার্চেন্ট অ্যাকুইজিশনের স্পষ্ট কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, পর্যটন এলাকায় ক্যাশলেস লেনদেনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। ভ্যান, ছোট দোকান এমনকি সমুদ্রসৈকতে চেয়ার ভাড়াও ডিজিটালি পরিশোধের ব্যবস্থা করা সম্ভব।

এর আগে সোমবার সকালে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে একটি র‌্যালি অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলে ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ক প্রচারপত্র বিতরণের মধ্য দিয়ে দু’দিনব্যাপী এই কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঢাকার বাইরে ১১টি স্থানে ইতোমধ্যে ক্যাশলেস প্রচারণা চালানো হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।