অস্ট্রেলিয়ার বন্ডি সৈকতে ইহুদি সম্প্রদায়ের উৎসবে সংঘটিত বন্দুক হামলায় এক হামলাকারীসহ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় সেখানে হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ধর্মীয় উৎসব হানুকার প্রথম দিনে সংঘটিত এই হামলায় আরও ২৯ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার সময় দুই পুলিশ সদস্যও গুলিবিদ্ধ হন। কর্মকর্তারা একে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। বেঁচে যাওয়া অপর বন্দুকধারী বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স বলেন, আজ রাতে অস্ট্রেলিয়ার ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের সময় প্রিয়জনদের হারানোর যন্ত্রণা কেমন, তা কল্পনা করাও কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ায় বন্দুক হামলা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। ১৯৯৬ সালে পোর্ট আর্থারে হামলায় ৩৫ জন নিহত হওয়ার পর এটিই দেশটির সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা।
বন্ডাই বিচ অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের পূর্ব সিডনিতে অবস্থিত। এটি দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত, যেখানে প্রতি বছর লাখো পর্যটক ভিড় করেন।
হানুকা কী?
হানুকা বা হিব্রু ভাষায় চানুকাহ, ইহুদি ধর্মের ‘আলো উৎসব’। ‘হানুকা’ শব্দের অর্থ ‘উৎসর্গ’। এটি ইহুদি ইতিহাসের অন্যতম বড় অলৌকিক ঘটনার স্মরণে উদ্যাপিত হয়। হানুকার তারিখ প্রতি বছর পরিবর্তিত হয়, তবে এটি সবসময় নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে পড়ে এবং টানা আট দিন ধরে পালিত হয়।
হামলার সময় বন্ডাই বিচে হানুকার প্রথম দিন উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠান চলছিল।
যা ঘটেছিল
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪৭ মিনিটে গোলাগুলির খবর পেয়ে নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শত শত মানুষ আতঙ্কে উপকূল এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে।
প্রাথমিক বিবৃতিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে এবং সাধারণ মানুষকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায়।
একই সময়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, ক্যাম্পবেল প্যারেড এলাকায় একাধিক মানুষ মাটিতে পড়ে ছিলেন।
বিবিসির যাচাই করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, ক্যাম্পবেল প্যারেডের পার্কিং এলাকা থেকে সৈকতের দিকে যাওয়া একটি ছোট সেতু থেকে দুই বন্দুকধারী গুলি ছুঁড়ছে। হানুকার প্রথম দিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি ওই সেতুর কাছেই চলছিল। এতে এক হাজারের বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
ভিডিওর এক অংশে দেখা যায়, হামলাকারীর পেছন থেকে গিয়ে ওই ব্যক্তি তাকে জাপটে ধরেন। অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার পর তিনি সেতুর দিকে সরে যান, যেখানে অপর হামলাকারী তখনও গুলি চালাচ্ছিল।
প্রিমিয়ার মিন্স তার সাহসিকতার প্রশংসা করে বলেন, ওই ব্যক্তি সত্যিকারের নায়ক। তার সাহসিকতার কারণেই আজ রাতে বহু মানুষ বেঁচে গেছেন।
ভিডিওর পরের অংশে আরেক ব্যক্তিকে আহত অবস্থায় পালাতে দেখা যায়। একই সময়ে একজন পুলিশ সদস্য পেছন থেকে এসে হামলাকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালান।
আরেকটি যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, সেতুর ওপর একাধিক পুলিশ সদস্য রয়েছেন। একজন নিথর ব্যক্তিকে সিপিআর দিতে দেখা যায়, তখন কেউ চিৎকার করে বলেন, “সে মারা গেছে, সে মারা গেছে।”
হতাহতের সংখ্যা কত?
পুলিশ জানিয়েছে, একজন বন্দুকধারী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে। নিহত ও আহতদের বিস্তারিত পরিচয় এখনও জানানো হয়নি।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এক হামলাকারীসহ মোট ১২ জন নিহত হয়েছেন। আরেক বন্দুকধারী সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ২৯ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং দুই পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
হানুকা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ব্যারি বিবিসিকে জানান, তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে সেখানে ছিলেন। গুলির শব্দ শুনে তিনি সেতুর ওপর থেকে দুই হামলাকারীকে জনতার দিকে গুলি ছুঁড়তে দেখেন।
তিনি জানান, মাটিতে তিনি অনেককে নিথর পড়ে থাকতে দেখেছেন। পরে তিনি সন্তানদের নিয়ে এক বন্ধুর গাড়িতে করে নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন।
সর্বশেষ পরিস্থিতি কী?
রবিবারের ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের চারপাশে একটি নিষিদ্ধ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। নিহত হামলাকারীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গাড়িতে পাওয়া তাৎক্ষণিক বিস্ফোরক ডিভাইস (আইইডি) পরীক্ষা করতে বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছে পুলিশ। জনসাধারণকে ওই এলাকা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশের কমিশনার মাল ল্যানিয়ন বলেন, এই তদন্তে কোনও কিছুই বাদ দেওয়া হবে না। এই মুহূর্তে হামলাকারীদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে না। সবাইকে শান্ত থাকার অনুরোধ করে তিনি বলেন, এখন প্রতিশোধের সময় নয়।
ল্যানিয়ন আরও জানান, পুলিশ হামলাকারীদের একজন সম্পর্কে আগে থেকে অবগত ছিল, তবে তার বিষয়ে তথ্য খুবই সীমিত।
আরও কোনও বন্দুকধারী জড়িত ছিল কি না, পুলিশ সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান মাইক বার্জেস বলেন, হামলাকারীরা নিরাপত্তা সংস্থার নজরে ছিল কি না, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা সময়োপযোগী নয়।
টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, বন্ডি সৈকতে যা ঘটেছে, তা ইহুদিবিদ্বেষপ্রসূত এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা, যা আমাদের জাতির বিবেকে আঘাত করেছে।
তিনি আরও বলেন, আজ আমরা দেখেছি, বিপদের দিকে ছুটে গিয়ে অন্যদের সাহায্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ানরা। তারা প্রকৃত নায়ক, এবং তাদের বিক্রম বহু জীবন বাঁচিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
রিপোর্টারের নাম 






















