ঢাকা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬

বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন বৈধ‍্যতামূলকভাবে ডিজিটালাইজেশন করতে হাইকোর্টের রায়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সব নাগরিক যেন এই ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট তানজিলা রহমান।

রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় বিয়ে ও তালাকের তথ্য কার্যকরভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না, যা পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের বৈধতা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। উপরন্তু, কোনও অপারেশনাল ও কার্যকর ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়, যা নাগরিকের সম্মান ও মৌলিক অধিকার— সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন করে।

আদালত স্পষ্ট করেন, ‘রাইট টু লাইফ’ শুধু বেঁচে থাকার অধিকার নয়; এটি মানবিক মর্যাদা রক্ষার অধিকারকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

রায়ে আরও বলা হয়, নিবন্ধন সংক্রান্ত আইন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ, অপারেশনাল ও কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আদালত নির্দেশনা দেন— বিয়ে ও তালাকের সব তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হবে, যাতে প্রতিটি তথ্য সরকারি ব্যবস্থায় সুরক্ষিত থাকে, ডাটাবেস সম্পূর্ণ কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য হয় এবং নাগরিকরা, বিশেষ করে নারীরা সহজেই তথ্য যাচাই করতে ও ডিজিটাল কপি সংগ্রহ করতে পারেন। পাশাপাশি আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দ্রুততম সময়ে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দাখিল করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় সম্পর্কে ইশরাত হাসান বলেন, বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই প্রতারণা রোধে হাইকোর্টের রায়টি যুগান্তকারী; যা দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিয়ে-তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা বন্ধে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বহু বছর ধরে কাগজভিত্তিক ম্যানুয়াল নিবন্ধন ব্যবস্থার কারণে একজন ব্যক্তি সহজেই তার আগের বিয়ে বা তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন করে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছিলেন। ফলে নতুন সঙ্গী প্রতারিত হচ্ছিলেন, পরিবার ভেঙে যাচ্ছিল এবং সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছিল বহু মানুষকে।

তিনি আরও বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত দেশের পরিবারের নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, আইনগত স্বচ্ছতা এবং সবচেয়ে বড় বিষয় বিয়ে ও তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা বন্ধে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। তার মতে, ডিজিটাল নিবন্ধন চালু হলে গোপন বিয়ে, একাধিক বিবাহ লুকানো, পূর্ববর্তী তথ্য গোপন, তালাক প্রমাণের জটিলতা– এসব সমস্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে এবং নাগরিকদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের পথ আরও সুদৃঢ় হবে।

বিয়ে ও তালাক নিয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই ২০২১ সালের ৪ মার্চ চার জন ভুক্তভোগীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি রিট দায়ের করেন।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় কোনও ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় আগের বিয়ে বা তালাকের সঠিক তথ্য যাচাই করা প্রায় অসম্ভব এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বিয়ে-তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২১ সালের ২২ মার্চ রুল জারি করে জানতে চান, কেন বিয়ে ও তালাকের তথ্য ডিজিটালভাবে নিবন্ধনের জন্য কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট তৈরি করা হবে না। সে রুলের শুনানি নিয়ে রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্ট।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন বৈধ‍্যতামূলকভাবে ডিজিটালাইজেশন করতে হাইকোর্টের রায়

আপডেট সময় : ১২:৫৩:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সব নাগরিক যেন এই ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। তার সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট তানজিলা রহমান।

রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় বিয়ে ও তালাকের তথ্য কার্যকরভাবে যাচাই করা সম্ভব হয় না, যা পারিবারিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করে এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের বৈধতা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। উপরন্তু, কোনও অপারেশনাল ও কার্যকর ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় প্রতারণার সুযোগ তৈরি হয়, যা নাগরিকের সম্মান ও মৌলিক অধিকার— সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত মানবিক মর্যাদা লঙ্ঘন করে।

আদালত স্পষ্ট করেন, ‘রাইট টু লাইফ’ শুধু বেঁচে থাকার অধিকার নয়; এটি মানবিক মর্যাদা রক্ষার অধিকারকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

রায়ে আরও বলা হয়, নিবন্ধন সংক্রান্ত আইন থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও কোনও পূর্ণাঙ্গ, অপারেশনাল ও কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই আদালত নির্দেশনা দেন— বিয়ে ও তালাকের সব তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করতে হবে, যাতে প্রতিটি তথ্য সরকারি ব্যবস্থায় সুরক্ষিত থাকে, ডাটাবেস সম্পূর্ণ কার্যকর ও ব্যবহারযোগ্য হয় এবং নাগরিকরা, বিশেষ করে নারীরা সহজেই তথ্য যাচাই করতে ও ডিজিটাল কপি সংগ্রহ করতে পারেন। পাশাপাশি আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে দ্রুততম সময়ে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট দাখিল করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় সম্পর্কে ইশরাত হাসান বলেন, বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনে ডিজিটাল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই প্রতারণা রোধে হাইকোর্টের রায়টি যুগান্তকারী; যা দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিয়ে-তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা বন্ধে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বহু বছর ধরে কাগজভিত্তিক ম্যানুয়াল নিবন্ধন ব্যবস্থার কারণে একজন ব্যক্তি সহজেই তার আগের বিয়ে বা তালাকের তথ্য গোপন করে নতুন করে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছিলেন। ফলে নতুন সঙ্গী প্রতারিত হচ্ছিলেন, পরিবার ভেঙে যাচ্ছিল এবং সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছিল বহু মানুষকে।

তিনি আরও বলেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত দেশের পরিবারের নিরাপত্তা, নারীর সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, আইনগত স্বচ্ছতা এবং সবচেয়ে বড় বিষয় বিয়ে ও তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা বন্ধে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে কাজ করবে। তার মতে, ডিজিটাল নিবন্ধন চালু হলে গোপন বিয়ে, একাধিক বিবাহ লুকানো, পূর্ববর্তী তথ্য গোপন, তালাক প্রমাণের জটিলতা– এসব সমস্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে এবং নাগরিকদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা, সুবিচার প্রতিষ্ঠা ও সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনের পথ আরও সুদৃঢ় হবে।

বিয়ে ও তালাক নিয়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েই ২০২১ সালের ৪ মার্চ চার জন ভুক্তভোগীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান একটি রিট দায়ের করেন।

রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় কোনও ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় আগের বিয়ে বা তালাকের সঠিক তথ্য যাচাই করা প্রায় অসম্ভব এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই বিয়ে-তালাক সংক্রান্ত প্রতারণা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২১ সালের ২২ মার্চ রুল জারি করে জানতে চান, কেন বিয়ে ও তালাকের তথ্য ডিজিটালভাবে নিবন্ধনের জন্য কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইট তৈরি করা হবে না। সে রুলের শুনানি নিয়ে রায় ঘোষণা করলেন হাইকোর্ট।