আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ওই ব্যক্তি যে তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা তাকওয়ার অধিকারী।” (সুরা হুজরাত-১৩)। তাকওয়া বা খোদাভীতি মানুষকে অন্তর থেকে পরিশুদ্ধ করে তোলে, আলোকিত করে, সৎকাজে উৎসাহ জোগায় এবং যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে থাকার প্রেরণা সৃষ্টি করে। তাকওয়া অর্জনের ফলেই একজন মানুষ সব ধরনের অন্যায়-অনাচার, যেমন—সুদ ও ঘুষ বর্জন করতে পারে এবং এর মাধ্যমে সমাজে একটি আদর্শ ও শান্তিপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, “আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে এবং কুপ্রবৃত্তি হতে নিজেকে বিরত রাখে, তার আবাসস্থল হলো জান্নাত।” (সুরা নাযিয়াত)। এই আয়াতে আল্লাহকে ভয় করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আবার অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমা লঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহতায়ালার রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার মালিক। তিনিই ক্ষমাশীল ও অনুগ্রহকারী।” (সুরা যুমার)। তাই মুমিনদের উচিত আল্লাহর আজাবের ভয় করা এবং একই সঙ্গে তাঁর রহমতের আশা করা—এই দুটি গুণ একত্রে অর্জন করা।
আল্লাহকে ভয় করে তাঁর থেকে দূরে সরে না গিয়ে, বরং তাঁর নিকটবর্তী হয়ে এবং তাঁর রহমতের আশাবাদী হয়েই আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। মানুষ সবসময় আল্লাহর আজাবের ভয় ও রহমতের আশা—এই দুইয়ের মাঝে অবস্থান করবে। ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, মানুষ যখন সুস্থ ও আর্থিকভাবে সবল থাকে, তখন আত্মনির্ভরশীলতার কারণে গুনাহ করার প্রবণতা বেশি থাকে। তখন গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আজাবকে বেশি ভয় করা উচিত। আল্লাহর আজাবের ভয় মানুষকে গোপন পাপ থেকেও রক্ষা করে থাকে।
ইতিহাসে বর্ণিত আছে, একবার হজরত ওমর (রা.) জনগণের অবস্থা জানতে ফজরের কিছুক্ষণ আগে গলি দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি একটি কুঁড়েঘর থেকে এক বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন। বৃদ্ধা তার কন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন, দুধ দোহন শেষ হয়েছে কিনা এবং কতটুকু হয়েছে। কন্যা উত্তরে বলল যে বকরি সামান্য পরিমাণ দুধ দিয়েছে। বৃদ্ধা বললেন, ক্রেতারা তো পূর্ণ পরিমাণ দুধই চাইবে। কন্যা বলল, বকরি তো কম দুধ দিয়েছে। তখন বৃদ্ধা বললেন, তাহলে পরিমাণ পূর্ণ করার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু পানি মিশিয়ে দাও। কন্যা সাথে সাথেই বলল, মা! আমিরুল মুমিনিন ওমর (রা.) তো এমন কাজ করতে নিষেধ করেছেন। বৃদ্ধা বললেন, আমিরুল মুমিনিন ওমর (রা.) তো এ সময়ে সব কিছু দেখছেন না। কন্যা বলল, “মা, আমিরুল মুমিনিন দেখছেন না, তবে আমিরুল মুমিনিনের আল্লাহ তো দেখছেন।” এটিই হলো আল্লাহকে ভয় করার জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ইতিহাসেই পাওয়া যায়, হজরত ওমর (রা.) পরে নিজ ছেলের সঙ্গে এই কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন এবং এই বিদুষী নারীর নাতিই ছিলেন ন্যায়পরায়ণতার জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আযিয (রহ.)।
হজরত রাসুলে পাক (সা.) এজন্যই আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন: “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তোমার এমন ভয় কামনা করি, যে ভয় আমার এবং আমার গুনাহের মাঝখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।” যেহেতু মানুষ দুর্বল এবং চেষ্টা করার পরেও গুনাহ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই বান্দা যাবে কোথায়? সেজন্যই আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেছেন, “আমার রাগ থেকে আমার রহমতের গতিই বেশি দ্রুত।” অতএব, যতই গুনাহ হোক না কেন, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। ভয় এবং রহমতের আশা—এই দুটিকে অন্তরে ধারণ করে আল্লাহর গোলামি করতে হবে।
কথিত আছে, হজরত মুসা (আ.) একবার সকালে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন: “হে আল্লাহ! এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুনাহগার ব্যক্তি কে? আমি তাকে দেখতে চাই।” আল্লাহতায়ালা বললেন, “অমুক জায়গায় বসা নাফরমান ব্যক্তিটিই সবচেয়ে গুনাহগার।” আবার বিকালে তিনি বললেন, “হে আল্লাহ! এ সময় তোমার সবচেয়ে বেশি ইবাদতকারী পছন্দনীয় ব্যক্তিটি কে? তাকে একটু দেখতে চাই।” আল্লাহতায়ালা বললেন, “অমুক জায়গায় বসা ব্যক্তিটিই আমার সবচেয়ে পছন্দনীয় ইবাদতকারী।” হজরত মুসা (আ.) তখন আল্লাহকে বললেন, “হে আল্লাহ! এই ব্যক্তি তো সেই ব্যক্তি, যাকে আপনি সকালেও বেশি বড় নাফরমান বলে আখ্যায়িত করেছিলেন!” আল্লাহতায়ালা বললেন, “লোকটিকে তার স্ত্রী নাফরমান বলে ধিক্কার দিয়েছে। তখন লোকটি বলল, ‘আমি গুনাহগার, তবে আমার আল্লাহ বহু রহমতকারী।’ এই বলে সে তওবা শুরু করে দিয়েছে। যেহেতু সে আমার রহমতের আশায় তওবা শুরু করেছে, সেহেতু আমি তাকে উত্তম ইবাদতকারী হিসেবে কবুল করে নিয়েছি।” অতএব, মূল কথা হলো—বেশি রহমতের আশায় গুনাহ করা যাবে না, আবার গুনাহ হয়ে গেলে অতি ভয়ের অজুহাতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াও যাবে না। ভয় এবং রহমতের আশা নিয়ে আল্লাহতায়ালা যেন আমাদের তাঁর গোলামি করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
রিপোর্টারের নাম 

























