ঢাকা ০৭:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

মুক্তাগাছায় একদিনে ২৫৩ জনকে হত্যা, দেখিয়ে দিয়েছিল রাজাকাররা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

১৯৭১ সালের ২ আগস্ট স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মানকোন, বিনোদবাড়ি, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার; এই চার গ্রামের নারী-শিশুসহ ২৫৩ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল। এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের বলবাড়িতেই হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে ১৮ জনকে। গুলিবিদ্ধ হন অনেকে। তাদের ধরে এনে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করে মাটি চাপা দিয়েছিল। গণহত্যার শিকার ২৫৩ জন শহীদদের নাম-সংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

তবে গণহত্যার এসব বধ্যভূমি শনাক্ত হলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও শহীদদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের নামে যা করা হয়েছে, তা হাস্যকর ও শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল। এ ছাড়া সেদিনের নিধনযজ্ঞ থেকে যারা প্রাণে বেঁচে ছিলেন তাদের খোঁজ নেয়নি কেউ। এমনকি শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে কারও স্বীকৃতিও মেলেনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ তারা।

দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের শহীদ পরিবারের সন্তান গুলিবিদ্ধ প্রত্যক্ষদর্শী জবান আলী (৭০) আক্ষেপ করে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেদিন তার পরিবারের সাত জন শহীদ হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বধ্যভূমি শনাক্ত করে তাতে স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। অথচ সেই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের নাম শ্বেতপাথরে বসানো হয়নি।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা মুক্তাগাছার গোটা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে নির্বিচারে গুলি করে নারী-শিশু ও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। পরে অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। একাত্তরে এটিই ছিল একদিনে মুক্তাগাছায় সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা। সেদিন গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল ২৫৩ জনকে। আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, সেদিন ছিল সোমবার। বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের অনেক নিম্নাঞ্চলের চারদিকে থই থই পানি। মাঠভর্তি আউশ ধান ও পাটের আবাদ। মুক্তাগাছা থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বড়গ্রাম ইউনিয়নের গ্রাম বিনোদবাড়ি, মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার। মুক্তাগাছা-জামালপুর সড়কের চেচুয়ার পথে ‘দড়িকৃষ্ণপুর’ এই মানকোন গ্রামেরই একটি পাড়া। সকাল ১০টা। সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত তিন মাসের শিশুসন্তানকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গৃহবধূ নূর বানু। এরই মধ্যে খবর আসে পাকিস্তানি আর্মি আসছে। অনেকের মতো নূর বানু স্বামীর সঙ্গে সন্তানদের নিয়ে ঘরের ভেতর আশ্রয় নেন। স্থানীয় রাজাকার জবেদ মুন্সি দুই পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে বাড়িতে ঢোকে নূর বানুর স্বামী রহমত আলী ও দেবর মোতালেবকে ডেকে উঠানে নিয়ে আসে। কোনও কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানি আর্মি গুলি করে লাশ ফেলে দেয় উঠানে। ভয়ে নূর বানুর ভাসুর কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। চোখের সামনে স্বামী, ভাসুর ও দেববের লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখেও শিশুপুত্র এবং দুই কন্যাকে আগলে ধরে ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকেন নূর বানু। একপর্যায়ে বাড়ির নারীদের চুলের মুঠি ধরে টেনে বাইরে এনে গুলি করে ফেলে রাখে উঠানে। পরে ঘরে ঘরে তল্লাশির সময় ধরে ফেলে নূর বানুকে। এক হাতে তিন মাসের শিশুপুত্র, আরেক হাতে পবিত্র কোরআন শরিফ। রাজাকার জবেদ মুন্সি কোলের শিশুকে বিছানায় শুইয়ে বাইরে আসার কথা বললে নূর বানু শিশুকে নিয়েই বাইরে আসেন। নূর বানুকে বাড়ির দুই ঘরের মাঝখানের ফাঁকে এক কাতারে দাঁড় করায় গোটা বাড়ির নারী ও শিশুদের সঙ্গে। ভয়ে অনেকের গলা শুকিয়ে যায়। কাঁদছিল হাউমাউ করে। কেবল শিশুরা ছিল নির্বাক। নূর বানু লাইনে সবার সামনে। পাকিস্তানি আর্মি গুলি চালায়। এ সময় কিছুটা নিচু হয়ে এক লাফে ঘরের ভেতরে যায় নূর। তারপরও নূর বানুর পিঠ গুলির আঘাতে রক্তাক্ত হয়। সেদিন এই বাড়ির ১৮ জন শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ লাশগুলো যখন রক্তের ওপর তখনও গুলি চলছিল অনবরত। এ ফাঁকে ঘরের পেছনের বেড়া ভেঙে তিন সন্তানকে নিয়ে আউশ ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকেন নূর বাুন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থাকেন। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরে স্বজনের লাশ দেখে নির্বাক ও নিথর হয়ে পড়েন। প্রতিবেশী কমলা ও সুরুজের বাবাবা রাতভর লাশ পাহারা দিয়ে রাখেন। পরদিন গোসল, কাফন ও জানাজা ছাড়াই গণকবরে পুতে রাখা হয় ১৮ শহীদের লাশ।

জাতীয় সংসদের জাতীয় পার্টির সাবেক স্পিকার ও মুসলীম লীগের সাবেক নেতা মরহুম শামসুল হুদা চৌধুরীর মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি গ্রামের বাড়িটি ছিল একাত্তরে অনেকের নিরাপদ ও ভরসার আশ্রয়স্থল। হিন্দু মালিকের কাছ থেকে কেনা ‘বলের বাড়ি’ নামে পরিচিত বাড়িতে তখন থাকতেন শামসুল হুদার ভাই আলী আকবর মুক্তার। পাকিস্তানি আর্মি আসছে খবর পেয়ে এলাকার নারী ও শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিল এই বাড়িতে।

বিনোদবাড়ি গ্রামের জবান আলী (৭৫) জানান, রাজাকার হাক্কু ও আমজাত পাকিস্তানি আর্মিদের কাছে এই বলবাড়িতে নারী ও শিশুদের আশ্রয় নেওয়ার কথা দেখিয়ে দেয়। আর্মিরা বাড়ির ভেতর থেকে নারী ও শিশুদের বাইরে এনে এক কাতারে দাঁড় করায়। এর মধ্যে প্রতিবেশী মন্ডল পরিবারের নবীজান, মেয়ে জুলেখা, মালেকা, ফেরদৌসী, রহিতন, বোন খালেতন ও তার মেয়ে হামিদা; এই সাত সদস্য ছিল। পাকিস্তানি আর্মিদের গুলিতে সেদিন বলবাড়িতে তিন শিশুসহ ১৭ নারী শহীদ হন। 

সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জবান আলী আরও জানান, বলবাড়িতে এই হত্যাকাণ্ডের পর নারী ও শিশুদের নাড়িভুঁড়ি ছিটকে গাছের ডালে ও ঘরের বেড়ায় ঝুলে ছিল। গোসল ও কাফন ছাড়াই পরনের রক্তাক্ত কাপড়ে ১৭ জনকে সেদিন এককবরে পুঁতে রাখা হয়েছিল। 

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, হিন্দু বাড়ি আক্রমণ করে পাকিস্তানি আর্মি এদিকে আসছে খবর পেয়ে পালাতে গিয়ে রাজাকার ও এক পাকিস্তানি আর্মির সামনে পড়ে যান জবানসহ মুসলিম লীগের রহমত, খালেক ও মতোলা এই চার জন। প্রথমেই জবানের সঙ্গী তিন মুসলিম লীগের নেতাদের পাকিস্তানি আর্মি ধরে নিয়ে যায়। তবে রাজাকার জবেদ মুন্সি চিনিয়ে দেয় জবানকে। এ সময় আর্মির কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নেন জবান। কিন্তু গুলি চালাতে না পারায় ফের কেড়ে নেয় পাকিস্তানি আর্মি। একপর্যায়ে গুলি চালালে জবান পড়ে যান মাটিতে। মৃত ভেবে জবানকে ফেলে যায় আর্মি। পরে ঘাটুরিয়া মামার বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা নেন।

সেদিন বেঁচে যাওয়া এই গ্রামের হাফিজা খাতুন জানান, পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়ে অনেকের সঙ্গে স্বামী কুমেদ আলী আশ্রয় নিয়েছিল স্থানীয় বাইয়া বিলে। আর্মিরা সেখানে গিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। খবর পেয়ে পরদিন বাইয়া বিলের শত লাশের স্তূপ থেকে স্বামীর লাশ নিয়ে বাড়িতে আসেন। স্বাধীনতার এতো বছরেও এই শহীদ পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি। 

পাকিস্তানি আর্মিরা একই দিন সামনের উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে কাতলসার গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ধরে নেয় ২৮ জনকে। এর মধ্যে এক বাড়ির ছিল সাত জন। রাজাকার করিম মুন্সির সহায়তায় আর্মিরা সেদিন ২৮ জনকে ধরে নিয়ে স্থানীয় কৈয়ার বিলপাড়ে জড়ো করে বসিয়ে রাখে। তাদের পাহারায় থাকে রাজাকার করিম মুন্সি ও অজ্ঞাত আরেক রাজাকার। আর্মিরা কাতলসার গ্রামের বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এরপর ২৮ জনকে এক কাতারে দাঁড়াতে বলে। এরই মধ্যে গুলি চালায়। গুলির আগে লাইনে থাকা শহীদ মন্নেছ আলী আর্মিদের অনুরোধ করে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে যারা দাপাদাপি করছিলেন আর্মিরা কেবল তাদেরই বারবার গুলি করেছিল। গুলিতে কৈয়ার বিলপাড়ে শহীদ হন ১৪ জন। এর মধ্যে সাত জনকে কাতলসার শহীদস্মৃতি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও অপর সাত জনকে বিলপাড়েই গণকবর দেওয়া হয়। 

বরাতগুনে সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান মাহমুদ, সোহরাব, সিদ্দিক ও ওয়াহেদসহ ১৪ জন। এসব হত্যাযজ্ঞের আগে পাকিস্তানি আর্মিরা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে বর্বরতার সূচনা করেছিল হিন্দু সংখ্যালঘু জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর বাড়ি আক্রমণের মধ্য দিয়ে। 

এই গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস (৬৯) ও শহীদ পরিবারের সদস্য কায়া রানী দে (৭৬) জানান, পাকিস্তানি আর্মিরা গ্রামে ঢুকেই প্রথমে ব্রাশ ফায়ার ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। বাড়ি বাড়ি খুঁজে লোকদের ধরে এনে ঠাকুর বাড়ির সামনে জড়ো করে। পরে রাজাকাররা বেছে বেছে কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়। ঠাকুর বাড়ির যতীন্দ্র কুমার রায়, দিলীপ কুমার ঠাকুর, নারায়ণ কুমার দে ও জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর এই চার জনকে এক কাতারে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েকদিন সেখানে পড়ে থাকায় নারায়ণের লাশ খেয়ে ফেলে শিয়াল ও কুকুরে।

এই গ্রামের বাসিন্দা কাশেম আলী (৬৯) জানান, তার বাবা শহীদ আজগর আলী ও ভাই উসমানকে ক্ষেতে হালচাষ করা অবস্থায় পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করেছিল। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য তাজ উদ্দিন (৬৮) জানান, ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি পাকিস্তানি আর্মি স্থানীয় রাজাকার নঈম উদ্দিন মাস্টার, জবেদ আলী মুন্সি, করিম ফকির, আতিকুর রহমান, আব্দুস সালাম, নজর আলী ফকিরের সহায়তায় বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে ঢুকেছিল সকাল ৮টার দিকে। ১০০-১৫০ আর্মি আটটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে হামলা চালায় প্রত্যেক গ্রামে। অগ্নিসংযোগের সঙ্গে চলে গণহত্যা। বিনোদনবাড়ি মানকোন থেকে সকালে শুরু হওয়া এই বর্বরতা চলে মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর, বনবাড়িয়া, কাতলসার, মীর্জাকান্দা, কৈয়ার বিলপাড় ও বাইয়া বিলের পাড়ের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। 

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কাশেম জানিয়েছেন, একদিনে সকাল থেকে বিকালের মধ্যে এই নিষ্ঠুর বর্বরতায় নারী-শিশুসহ ২৫৩ জনকে হত্যা করেছিল হানাদার বাহিনী। এতে সহযোগিতা করেছিল স্থানীয় রাজাকাররা।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের শহীদদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি বধ্যভূমি-গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এগুলো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ভাঙাচোরা কাঠামো নিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।’

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনে রাশিয়ার কড়া বার্তা: অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও বেসামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান

মুক্তাগাছায় একদিনে ২৫৩ জনকে হত্যা, দেখিয়ে দিয়েছিল রাজাকাররা

আপডেট সময় : ০৯:০৯:১৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০২৫

১৯৭১ সালের ২ আগস্ট স্থানীয় রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মানকোন, বিনোদবাড়ি, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার; এই চার গ্রামের নারী-শিশুসহ ২৫৩ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল। এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের বলবাড়িতেই হত্যা করা হয়েছিল একসঙ্গে ১৮ জনকে। গুলিবিদ্ধ হন অনেকে। তাদের ধরে এনে নির্মমভাবে নির্যাতন ও হত্যা করে মাটি চাপা দিয়েছিল। গণহত্যার শিকার ২৫৩ জন শহীদদের নাম-সংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

তবে গণহত্যার এসব বধ্যভূমি শনাক্ত হলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও শহীদদের নামফলকসহ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভের নামে যা করা হয়েছে, তা হাস্যকর ও শহীদদের প্রতি অবমাননার শামিল। এ ছাড়া সেদিনের নিধনযজ্ঞ থেকে যারা প্রাণে বেঁচে ছিলেন তাদের খোঁজ নেয়নি কেউ। এমনকি শহীদ পরিবারের সন্তান হিসেবে কারও স্বীকৃতিও মেলেনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ ও হতাশ তারা।

দড়িকৃষ্ণপুর গ্রামের শহীদ পরিবারের সন্তান গুলিবিদ্ধ প্রত্যক্ষদর্শী জবান আলী (৭০) আক্ষেপ করে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, সেদিন তার পরিবারের সাত জন শহীদ হন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বধ্যভূমি শনাক্ত করে তাতে স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়। অথচ সেই স্মৃতিস্তম্ভে শহীদদের নাম শ্বেতপাথরে বসানো হয়নি।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদরদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা মুক্তাগাছার গোটা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে নির্বিচারে গুলি করে নারী-শিশু ও সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। পরে অগ্নিসংযোগ করে গ্রামের বহু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। একাত্তরে এটিই ছিল একদিনে মুক্তাগাছায় সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা। সেদিন গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল ২৫৩ জনকে। আরও অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।’

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্যমতে, সেদিন ছিল সোমবার। বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের অনেক নিম্নাঞ্চলের চারদিকে থই থই পানি। মাঠভর্তি আউশ ধান ও পাটের আবাদ। মুক্তাগাছা থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বড়গ্রাম ইউনিয়নের গ্রাম বিনোদবাড়ি, মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর ও কাতলসার। মুক্তাগাছা-জামালপুর সড়কের চেচুয়ার পথে ‘দড়িকৃষ্ণপুর’ এই মানকোন গ্রামেরই একটি পাড়া। সকাল ১০টা। সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত তিন মাসের শিশুসন্তানকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গৃহবধূ নূর বানু। এরই মধ্যে খবর আসে পাকিস্তানি আর্মি আসছে। অনেকের মতো নূর বানু স্বামীর সঙ্গে সন্তানদের নিয়ে ঘরের ভেতর আশ্রয় নেন। স্থানীয় রাজাকার জবেদ মুন্সি দুই পাকিস্তানি আর্মি নিয়ে বাড়িতে ঢোকে নূর বানুর স্বামী রহমত আলী ও দেবর মোতালেবকে ডেকে উঠানে নিয়ে আসে। কোনও কিছু বুঝে উঠার আগেই পাকিস্তানি আর্মি গুলি করে লাশ ফেলে দেয় উঠানে। ভয়ে নূর বানুর ভাসুর কোরআন শরিফ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। চোখের সামনে স্বামী, ভাসুর ও দেববের লাশ পড়ে থাকার দৃশ্য দেখেও শিশুপুত্র এবং দুই কন্যাকে আগলে ধরে ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকেন নূর বানু। একপর্যায়ে বাড়ির নারীদের চুলের মুঠি ধরে টেনে বাইরে এনে গুলি করে ফেলে রাখে উঠানে। পরে ঘরে ঘরে তল্লাশির সময় ধরে ফেলে নূর বানুকে। এক হাতে তিন মাসের শিশুপুত্র, আরেক হাতে পবিত্র কোরআন শরিফ। রাজাকার জবেদ মুন্সি কোলের শিশুকে বিছানায় শুইয়ে বাইরে আসার কথা বললে নূর বানু শিশুকে নিয়েই বাইরে আসেন। নূর বানুকে বাড়ির দুই ঘরের মাঝখানের ফাঁকে এক কাতারে দাঁড় করায় গোটা বাড়ির নারী ও শিশুদের সঙ্গে। ভয়ে অনেকের গলা শুকিয়ে যায়। কাঁদছিল হাউমাউ করে। কেবল শিশুরা ছিল নির্বাক। নূর বানু লাইনে সবার সামনে। পাকিস্তানি আর্মি গুলি চালায়। এ সময় কিছুটা নিচু হয়ে এক লাফে ঘরের ভেতরে যায় নূর। তারপরও নূর বানুর পিঠ গুলির আঘাতে রক্তাক্ত হয়। সেদিন এই বাড়ির ১৮ জন শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ লাশগুলো যখন রক্তের ওপর তখনও গুলি চলছিল অনবরত। এ ফাঁকে ঘরের পেছনের বেড়া ভেঙে তিন সন্তানকে নিয়ে আউশ ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকেন নূর বাুন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থাকেন। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরে স্বজনের লাশ দেখে নির্বাক ও নিথর হয়ে পড়েন। প্রতিবেশী কমলা ও সুরুজের বাবাবা রাতভর লাশ পাহারা দিয়ে রাখেন। পরদিন গোসল, কাফন ও জানাজা ছাড়াই গণকবরে পুতে রাখা হয় ১৮ শহীদের লাশ।

জাতীয় সংসদের জাতীয় পার্টির সাবেক স্পিকার ও মুসলীম লীগের সাবেক নেতা মরহুম শামসুল হুদা চৌধুরীর মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি গ্রামের বাড়িটি ছিল একাত্তরে অনেকের নিরাপদ ও ভরসার আশ্রয়স্থল। হিন্দু মালিকের কাছ থেকে কেনা ‘বলের বাড়ি’ নামে পরিচিত বাড়িতে তখন থাকতেন শামসুল হুদার ভাই আলী আকবর মুক্তার। পাকিস্তানি আর্মি আসছে খবর পেয়ে এলাকার নারী ও শিশুরা আশ্রয় নিয়েছিল এই বাড়িতে।

বিনোদবাড়ি গ্রামের জবান আলী (৭৫) জানান, রাজাকার হাক্কু ও আমজাত পাকিস্তানি আর্মিদের কাছে এই বলবাড়িতে নারী ও শিশুদের আশ্রয় নেওয়ার কথা দেখিয়ে দেয়। আর্মিরা বাড়ির ভেতর থেকে নারী ও শিশুদের বাইরে এনে এক কাতারে দাঁড় করায়। এর মধ্যে প্রতিবেশী মন্ডল পরিবারের নবীজান, মেয়ে জুলেখা, মালেকা, ফেরদৌসী, রহিতন, বোন খালেতন ও তার মেয়ে হামিদা; এই সাত সদস্য ছিল। পাকিস্তানি আর্মিদের গুলিতে সেদিন বলবাড়িতে তিন শিশুসহ ১৭ নারী শহীদ হন। 

সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া জবান আলী আরও জানান, বলবাড়িতে এই হত্যাকাণ্ডের পর নারী ও শিশুদের নাড়িভুঁড়ি ছিটকে গাছের ডালে ও ঘরের বেড়ায় ঝুলে ছিল। গোসল ও কাফন ছাড়াই পরনের রক্তাক্ত কাপড়ে ১৭ জনকে সেদিন এককবরে পুঁতে রাখা হয়েছিল। 

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, হিন্দু বাড়ি আক্রমণ করে পাকিস্তানি আর্মি এদিকে আসছে খবর পেয়ে পালাতে গিয়ে রাজাকার ও এক পাকিস্তানি আর্মির সামনে পড়ে যান জবানসহ মুসলিম লীগের রহমত, খালেক ও মতোলা এই চার জন। প্রথমেই জবানের সঙ্গী তিন মুসলিম লীগের নেতাদের পাকিস্তানি আর্মি ধরে নিয়ে যায়। তবে রাজাকার জবেদ মুন্সি চিনিয়ে দেয় জবানকে। এ সময় আর্মির কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নেন জবান। কিন্তু গুলি চালাতে না পারায় ফের কেড়ে নেয় পাকিস্তানি আর্মি। একপর্যায়ে গুলি চালালে জবান পড়ে যান মাটিতে। মৃত ভেবে জবানকে ফেলে যায় আর্মি। পরে ঘাটুরিয়া মামার বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা নেন।

সেদিন বেঁচে যাওয়া এই গ্রামের হাফিজা খাতুন জানান, পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়ে অনেকের সঙ্গে স্বামী কুমেদ আলী আশ্রয় নিয়েছিল স্থানীয় বাইয়া বিলে। আর্মিরা সেখানে গিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে। খবর পেয়ে পরদিন বাইয়া বিলের শত লাশের স্তূপ থেকে স্বামীর লাশ নিয়ে বাড়িতে আসেন। স্বাধীনতার এতো বছরেও এই শহীদ পরিবারের কেউ খোঁজ নেয়নি। 

পাকিস্তানি আর্মিরা একই দিন সামনের উত্তর পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে কাতলসার গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে ধরে নেয় ২৮ জনকে। এর মধ্যে এক বাড়ির ছিল সাত জন। রাজাকার করিম মুন্সির সহায়তায় আর্মিরা সেদিন ২৮ জনকে ধরে নিয়ে স্থানীয় কৈয়ার বিলপাড়ে জড়ো করে বসিয়ে রাখে। তাদের পাহারায় থাকে রাজাকার করিম মুন্সি ও অজ্ঞাত আরেক রাজাকার। আর্মিরা কাতলসার গ্রামের বাড়ি বাড়ি অগ্নিসংযোগ করে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। এরপর ২৮ জনকে এক কাতারে দাঁড়াতে বলে। এরই মধ্যে গুলি চালায়। গুলির আগে লাইনে থাকা শহীদ মন্নেছ আলী আর্মিদের অনুরোধ করে দুই রাকাত নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে যারা দাপাদাপি করছিলেন আর্মিরা কেবল তাদেরই বারবার গুলি করেছিল। গুলিতে কৈয়ার বিলপাড়ে শহীদ হন ১৪ জন। এর মধ্যে সাত জনকে কাতলসার শহীদস্মৃতি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ও অপর সাত জনকে বিলপাড়েই গণকবর দেওয়া হয়। 

বরাতগুনে সেদিন গুলিবিদ্ধ হয়েও বেঁচে যান মাহমুদ, সোহরাব, সিদ্দিক ও ওয়াহেদসহ ১৪ জন। এসব হত্যাযজ্ঞের আগে পাকিস্তানি আর্মিরা বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে বর্বরতার সূচনা করেছিল হিন্দু সংখ্যালঘু জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর বাড়ি আক্রমণের মধ্য দিয়ে। 

এই গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস (৬৯) ও শহীদ পরিবারের সদস্য কায়া রানী দে (৭৬) জানান, পাকিস্তানি আর্মিরা গ্রামে ঢুকেই প্রথমে ব্রাশ ফায়ার ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। বাড়ি বাড়ি খুঁজে লোকদের ধরে এনে ঠাকুর বাড়ির সামনে জড়ো করে। পরে রাজাকাররা বেছে বেছে কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়। ঠাকুর বাড়ির যতীন্দ্র কুমার রায়, দিলীপ কুমার ঠাকুর, নারায়ণ কুমার দে ও জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর এই চার জনকে এক কাতারে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েকদিন সেখানে পড়ে থাকায় নারায়ণের লাশ খেয়ে ফেলে শিয়াল ও কুকুরে।

এই গ্রামের বাসিন্দা কাশেম আলী (৬৯) জানান, তার বাবা শহীদ আজগর আলী ও ভাই উসমানকে ক্ষেতে হালচাষ করা অবস্থায় পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করেছিল। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য তাজ উদ্দিন (৬৮) জানান, ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি পাকিস্তানি আর্মি স্থানীয় রাজাকার নঈম উদ্দিন মাস্টার, জবেদ আলী মুন্সি, করিম ফকির, আতিকুর রহমান, আব্দুস সালাম, নজর আলী ফকিরের সহায়তায় বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে ঢুকেছিল সকাল ৮টার দিকে। ১০০-১৫০ আর্মি আটটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে হামলা চালায় প্রত্যেক গ্রামে। অগ্নিসংযোগের সঙ্গে চলে গণহত্যা। বিনোদনবাড়ি মানকোন থেকে সকালে শুরু হওয়া এই বর্বরতা চলে মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর, বনবাড়িয়া, কাতলসার, মীর্জাকান্দা, কৈয়ার বিলপাড় ও বাইয়া বিলের পাড়ের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। 

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কাশেম জানিয়েছেন, একদিনে সকাল থেকে বিকালের মধ্যে এই নিষ্ঠুর বর্বরতায় নারী-শিশুসহ ২৫৩ জনকে হত্যা করেছিল হানাদার বাহিনী। এতে সহযোগিতা করেছিল স্থানীয় রাজাকাররা।

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক, লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বিমল পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামের শহীদদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি বধ্যভূমি-গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এগুলো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। ভাঙাচোরা কাঠামো নিয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।’