রাজশাহী প্রতিনিধি
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা, উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর দলটির কিছু নেতাকর্মী ও সমর্থক সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন এবং পুরোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্ভাব্য যেকোনো রাজনৈতিক তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সম্প্রতি রাজশাহী মহানগর ও জেলার কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগের নামে বিক্ষোভ মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে কয়েকজনকে মুখে মাস্ক পরে মিছিল করতে দেখা যায়। সেখানে দলীয় নেতাদের মুক্তির দাবি এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও শোনা যায়। এসব ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সম্প্রতি সাংগঠনিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় ছোট পরিসরে বৈঠক, পুরোনো নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শামসুজ্জামান আওয়াল জামিনে মুক্ত হওয়ার পর দলীয় যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। একইসঙ্গে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজন নেতাও বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
দলীয় সূত্রের দাবি, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের পাশাপাশি দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সীমিত পরিসরে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে বলেও জানা গেছে। এসব বৈঠকে পুরোনো নেতাকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
এদিকে সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও রেঞ্জ ডিআইজিদের বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এতে সম্ভাব্য মিছিল, সমাবেশ, পতাকা উত্তোলন বা রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) এক কর্মকর্তা জানান, যে কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। কেউ আইন ভঙ্গের চেষ্টা করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরএমপির মুখপাত্র গাজিউর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো যাতে কোনো প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে না পারে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি নতুন করে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে, জনগণ তা মেনে নেবে না। তবে বিষয়টি নিয়ে দলীয়ভাবে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
জামায়াতে ইসলামীর মহানগর সাংগঠনিক সেক্রেটারি জসিম উদ্দিন সরকার বলেন, কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যদি গোপনে বা প্রকাশ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করে, তাহলে তা প্রতিহত করা হবে। একইসঙ্গে প্রশাসনের প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলী বলেন, দেশে নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টি হোক, তা কেউ চায় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। নগরীর সাহেববাজার এলাকার ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হোক, তা কেউ চায় না। শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকাই সবার প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আনোয়ার হোসেন মনে করেন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে রাজশাহীর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা এখন নজরে রাখছে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ।
রিপোর্টারের নাম 























