ঢাকা ১২:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

বিভক্ত ভারতে জেন-জি’র নীরবতা: বিদ্রোহের প্রতীক্ষায় এক প্রজন্ম

ভারতের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে যুবসমাজ বরাবরই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর এখনো সেই প্রশ্নেরই কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান জেন-জি জেনারেশন। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম আজ ভারতের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ কোটি। পৃথিবীর সব জেন-জি জেনারেশনই প্রযুক্তিতে দক্ষ, তথ্যসচেতন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দুর্নীতি, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার—কোনো কিছুই তাদের অজানা নয়। তবু ভারতের এই বিশাল যুবশক্তির রাজপথে দীর্ঘ অনুপস্থিতি অতীতে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণেরা রাষ্ট্রীয় দমনকে উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখেছিলেন। সত্তরের দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার চালিকাশক্তি ছিল যুবসমাজ। দুই হাজার দশকের শুরুতে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণের পর দেশজুড়ে বিস্ফোরিত প্রতিবাদ—সবখানেই তরুণরাই ছিল অগ্রভাগে।

২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও প্রতিবাদের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জেন-জির সক্রিয় অংশগ্রহণ স্পষ্ট করে দেয়—এই প্রজন্ম নীরব বা অসচেতন নয়। কিন্তু পুলিশি দমন, রাষ্ট্রবিরোধী তকমা এবং ছাত্রনেতাদের দীর্ঘ কারাবাস সেই আন্দোলনের স্বাভাবিক বিকাশ থামিয়ে দেয়। এখান থেকে শুরু হয় নীরবতার এক দীর্ঘ পর্ব।

এই নীরবতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণও রয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত কারণ হলো ভারতের ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা। ২৮টি রাজ্য ও আটটি ইউনিয়ন টেরিটরি নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিকভাবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও বিভক্ত। সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষা এবং কয়েক শত কথ্য ভাষা ভারতের বৈচিত্র্যের প্রতীক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বৈচিত্র্য জাতীয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। প্রতিটি রাজ্যে ক্ষোভ বা বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ বা বিদ্রোহের ভাষা, লক্ষ্য ও শত্রু আলাদা। অন্ধ্রপ্রদেশে ভূমি অধিকার ও ল্যান্ড টাইটলিং আইন কৃষকদের উদ্বিগ্ন করছে। আসামে এসটি স্ট্যাটাস ও অভিবাসন প্রশ্ন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি করছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব অর্থনীতিতে সেমিকন্ডাক্টরের রাজত্ব এবং বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা

বিভক্ত ভারতে জেন-জি’র নীরবতা: বিদ্রোহের প্রতীক্ষায় এক প্রজন্ম

আপডেট সময় : ১০:১১:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

ভারতের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক ইতিহাসে যুবসমাজ বরাবরই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আর এখনো সেই প্রশ্নেরই কেন্দ্রে রয়েছে বর্তমান জেন-জি জেনারেশন। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম আজ ভারতের জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩৭ কোটি। পৃথিবীর সব জেন-জি জেনারেশনই প্রযুক্তিতে দক্ষ, তথ্যসচেতন, সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এবং বৈশ্বিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দুর্নীতি, বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার—কোনো কিছুই তাদের অজানা নয়। তবু ভারতের এই বিশাল যুবশক্তির রাজপথে দীর্ঘ অনুপস্থিতি অতীতে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

ভারতে স্বাধীনতা সংগ্রামে তরুণেরা রাষ্ট্রীয় দমনকে উপেক্ষা করে জীবন বাজি রেখেছিলেন। সত্তরের দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যে গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার চালিকাশক্তি ছিল যুবসমাজ। দুই হাজার দশকের শুরুতে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণের পর দেশজুড়ে বিস্ফোরিত প্রতিবাদ—সবখানেই তরুণরাই ছিল অগ্রভাগে।

২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আবারও প্রতিবাদের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে জেন-জির সক্রিয় অংশগ্রহণ স্পষ্ট করে দেয়—এই প্রজন্ম নীরব বা অসচেতন নয়। কিন্তু পুলিশি দমন, রাষ্ট্রবিরোধী তকমা এবং ছাত্রনেতাদের দীর্ঘ কারাবাস সেই আন্দোলনের স্বাভাবিক বিকাশ থামিয়ে দেয়। এখান থেকে শুরু হয় নীরবতার এক দীর্ঘ পর্ব।

এই নীরবতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণও রয়েছে, তবে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত কারণ হলো ভারতের ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা। ২৮টি রাজ্য ও আটটি ইউনিয়ন টেরিটরি নিয়ে গঠিত এই রাষ্ট্র কেবল প্রশাসনিকভাবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও বিভক্ত। সংবিধানে স্বীকৃত ২২টি ভাষা এবং কয়েক শত কথ্য ভাষা ভারতের বৈচিত্র্যের প্রতীক হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বৈচিত্র্য জাতীয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে রয়েছে। প্রতিটি রাজ্যে ক্ষোভ বা বিদ্রোহ আছে, কিন্তু সেই ক্ষোভ বা বিদ্রোহের ভাষা, লক্ষ্য ও শত্রু আলাদা। অন্ধ্রপ্রদেশে ভূমি অধিকার ও ল্যান্ড টাইটলিং আইন কৃষকদের উদ্বিগ্ন করছে। আসামে এসটি স্ট্যাটাস ও অভিবাসন প্রশ্ন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সৃষ্টি করছে।