বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) আওতাধীন তিতাস-৩১ নম্বর গভীর কূপ খনন প্রকল্পটি সব ধরনের ভয়-ভীতি ও ঝুঁকি কাটিয়ে হাইপ্রেসার বা উচ্চচাপ জোনে সফলভাবে প্রবেশ করেছে। অতীতে তিতাস গ্যাস ফিল্ডে অত্যধিক চাপের কারণে ৩,৬৮০ মিটারের গভীরে খনন করা সম্ভব হয়নি এবং সেখান থেকেই ফিরে আসতে হয়েছিল। তবে বর্তমান গভীর কূপ খনন প্রকল্পের মাধ্যমে গত ২৫ জুলাই ইতোমধ্যে ৩,৭২০ মিটার সীমানা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে, যা ভূগর্ভস্থ গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
প্রকল্পের পরিচালক মো. মাহমুদুল নবাব জানান, অতীতে যেই হাইপ্রেসার জোনের ভীতি ছিল, অত্যন্ত সফলতার সাথে সেই সীমারেখা অতিক্রম করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে কূপে প্রতি বর্গইঞ্চিতে প্রায় ১১ হাজার পিএসআই (PSI) চাপ বা প্রেসার দেখা যাচ্ছে। খননকাজের সময় ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা গেলেও মূল ও প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে খনন শেষে লগিং এবং ডিএসটি (ডাউনহোল স্ট্রিপিং টেস্ট) সম্পন্ন করার পর। তবে পুরো প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে আরও অন্তত চার মাসের মতো সময় লাগবে।
সাধারণত তিতাস গ্যাস ফিল্ডে ৩,৭০০ মিটারের ওপরের স্তরগুলো থেকে এতদিন গ্যাস উত্তোলন করা হতো। তবে চলমান এই প্রকল্পের আওতায় ৫,৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খনন করা হবে। ২০১১ সালে বাপেক্স পরিচালিত থ্রিডি সিসমিক সার্ভে এবং পরবর্তীতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তা নিরীক্ষা করে জানা গেছে, তিতাস-৩১ কূপটির চারটি আলাদা স্তরে অন্তত ২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার শক্তিশালী সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সম্ভাবনা নিয়ে বিজিএফসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল জলিল প্রামানিক জানান, তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের সোর্স রকের অবস্থান ভূগর্ভের প্রায় ৫,০০০ মিটারেরও বেশি নিচে। বর্তমানে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে ২,৭০০ মিটার স্তরে অবস্থিত ক্ষেত্র থেকে। যেহেতু উৎসের যতো কাছাকাছি যাওয়া যাবে, গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনাও ততো বৃদ্ধি পাবে, তাই এই অনুসন্ধান সফল হলে দেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। উল্লেখ্য, ভারতের আগরতলায় ৪,৬০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খনন করা হয়েছে এবং বিশ্বে ১২,০০০ মিটার পর্যন্ত গভীর কূপ খননের রেকর্ড রয়েছে। মজুদের ভিত্তিতে বর্তমানে তিতাসই দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র, যেখান থেকে ইতোমধ্যে ৫.৬৮ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হলেও অবশিষ্ট মজুদ ধরা হয় ১.৬৫ টিসিএফ। এর পাশাপাশি গভীরে আরও ২ টিসিএফ গ্যাস পাওয়ার জোরালো আশা করা হচ্ছে।
সাধারণত বাংলাদেশে ২,৬০০ থেকে ৪,০০০ মিটারের মধ্যে কূপ খনন করে গ্যাস তোলা হলেও ফেঞ্চুগঞ্জ-২ সহ কয়েকটি কূপে ৪,৯০০ মিটার পর্যন্ত কাজ করা হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক গঠন অনুযায়ী গ্যাস স্তরের নিচে রয়েছে কঠিন শিলার স্তর। বাপেক্সের ত্রিমাত্রিক জরিপ বলছে, কঠিন শিলার নিচেই থাকতে পারে গ্যাসের বিপুল আঁধার; যেখানে শ্রীকাইলে ৯২৬ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) এবং তিতাসে ১.৫৮ টিসিএফসহ মোট প্রায় আড়াই টিসিএফ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ভূগর্ভের সেই কঠিন শিলার নিচে বাস্তবে কী রয়েছে, তা খনন কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমানে দেশীয় সংস্থাগুলোর গভীর কূপ খননের অভিজ্ঞতা না থাকায় বিদেশি ঠিকাদার নিয়োগ করে গভীর খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, বিজিএফসিএলের তিতাস-৩১ ও বাখরাবাদ-১১ এবং বাপেক্সের শ্রীকাইল ও মোবারকপুর—এই চারটি কূপে ডিপ ড্রিলিং বা গভীর খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী। তিনি জানান, হাইপ্রেসার জোনের পরের স্তরে প্রেসারের ওঠানামা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তাই সার্বক্ষণিক মাঠে থেকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দক্ষ ও যোগ্য লোক নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে অনুমতির জন্য জ্বালানি বিভাগ বা পেট্রোবাংলার চিঠির অপেক্ষায় থাকলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এখানে সাফল্য আসলে দেশ একটি বড় আকারের গ্যাসের রিজার্ভ পাবে।
বর্তমানে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই অবশিষ্ট গ্যাসের মজুদ ছিল ৮.৬৭ টিসিএফ। আগে যেখানে প্রতিদিন ২,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হতো, বর্তমানে তা কমে ১৬৪৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অপরদিকে দেশে দৈনিক চাহিদা ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২,৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই বিশাল ঘাটতির কারণে শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে এবং ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে দেশীয় অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলাফল হিসেবে মনে করছেন।
উল্লেখ্য, দেশে ১-১৫ বছরে ১০১টি কূপ খনন করে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করা হয়েছে, যার বাইরে মোবারকপুর, কশবা বা জামালপুরের মতো এলাকায় গ্যাস মিললেও তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। সমুদ্রসীমা ও পশ্চিমাঞ্চল এতদিন আলোচনার বাইরে থাকলেও মায়ানমার কর্তৃক বঙ্গোপসাগরের নিজস্ব সীমানা থেকে গ্যাস উত্তোলন এবং ভারতের অশোকনগরে তেল আবিষ্কারের পর বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলেও (রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা) নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 
























