সদ্যবিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের (জুলাই থেকে মে) অর্থনৈতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে যে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয় এসেছে, তার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশেরই উৎস হলো বিশ্বের প্রধান পাঁচটি দেশ। এই শীর্ষ পাঁচটি দেশ হচ্ছে—সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র। মূলত বিশ্বজুড়ে ছড়ানো প্রবাসীদের মধ্যে এসব দেশেই সবচেয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী ও প্রবাসী স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাস করায় এই নির্দিষ্ট দেশগুলো থেকেই দেশের প্রবাসী আয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি অর্জিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’-এর একটি সাম্প্রতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত প্রবাসীরা সব মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ২৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ বিশাল রেমিট্যান্স বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল এককভাবে শীর্ষ পাঁচটি দেশ থেকেই দেশে প্রবেশ করেছে ২ হাজার ২৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট অর্জিত প্রবাসী আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশের সমান।
ব্যাংকিং খাতের তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচিত এই ১১ মাসের সময়কালে সর্বোচ্চ ৫২৭ কোটি ৯৭ লাখ মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীরা, যা বাংলাদেশের মোট প্রাপ্ত রেমিট্যান্সের এককভাবে ১৬ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। এই তালিকার ৪২৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তৃতীয় স্থানে, ৩২২ কোটি ডলার নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া চতুর্থ স্থানে এবং ২৭৮ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
এই শীর্ষ ৫টি প্রধান দেশের বাইরেও ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর এবং ইতালি থেকেও চলতি অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবাসী আয় বাংলাদেশে এসেছে। এই ৬টি দেশ থেকে বিগত ১১ মাসে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ৮৮৯ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে সার্বিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এসেছে মূলত এই নির্দিষ্ট ১১টি দেশ থেকে।
কেবল মাত্র মে (২০২৬) মাসের একক হিসাব পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, সে মাসে দেশে রেমিট্যান্সের সার্বিক প্রবাহ ছিল অত্যন্ত চোখে পড়ার মতো। ওই একটি নির্দিষ্ট মাসেই প্রবাসীরা সর্বমোট ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। তবে মে মাসের পরিসংখ্যানে একটি বড় পরিবর্তন দেখা গেছে; ওই মাসে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৬৫ কোটি ৯ লাখ ডলার এসেছে যুক্তরাজ্য থেকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার এসেছে দীর্ঘদিনের শীর্ষে থাকা সৌদি আরব থেকে। আর ৪৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে তালিকায় তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসের দীর্ঘ মেয়াদের মধ্যে টানা ১০টি মাসই এককভাবে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের প্রধান ও শীর্ষে থাকা উৎস ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। তবে মে মাসে এসে নাটকীয়ভাবে সৌদিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে আসে যুক্তরাজ্য। অর্থবছরের একেবারে সূচনায়, অর্থাৎ গত বছরের জুলাই মাসে যুক্তরাজ্য থেকে মাত্র ২৮ কোটি ২৫ লাখ ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে এসেছিল। পরবর্তীতে সেখান থেকে প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে দ্রুত বাড়তে বাড়তে মে মাসে এসে অবিশ্বাস্য ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৫ কোটি ডলারে পৌঁছে যায়। তবে বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাস জুনের পূর্ণাঙ্গ রেমিট্যান্সের সরকারি তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কিছুদিন ধরেই প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে নানাভাবে নিরবচ্ছিন্ন উৎসাহ ও প্রণোদনা দিয়ে আসছে। এর প্রধান অংশ হিসেবে ব্যাংকিং মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠালে নগদ আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হচ্ছে, যার ফলে হুন্ডির মতো ক্ষতিকর ও অবৈধ মাধ্যমগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটিকে অনেক বেশি সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করা হয়েছে। এসব নানামুখী ইতিবাচক সরকারি পদক্ষেপের সার্বিক প্রভাবই মূলত দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তবে দেশের আর্থিক ও অর্থনীতি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা সতর্ক করে বলছেন, দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশই মাত্র পাঁচটি দেশের ওপর এককভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁদের সুচিন্তিত মতামত অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সাধারণত অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বেশি থাকায় সেখানকার রেমিট্যান্স পাঠানোর হার সব সময় একরকম বা স্থিতিশীল থাকে না। এর বিপরীতে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক, পেশাগত ও অর্থনৈতিক অবস্থান তুলনামূলক অনেক শক্ত ও স্থায়ী হওয়ায় সেখান থেকে প্রবাসী আয় অনেক বেশি স্থিতিশীল ও নিয়মিতভাবে দেশে আসে।
অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান এই শীর্ষ পাঁচটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা তাঁদের নিজস্ব শ্রমবাজারে হঠাৎ কোনো বড় পরিবর্তন বা সংকট দেখা দিলে তার সরাসরি ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আসার ওপর। আর প্রবাসী আয় কমলে তার প্রত্যক্ষ ধাক্কা গিয়ে লাগবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। তাই নির্দিষ্ট কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে এনে ইউরোপের অন্যান্য দেশ, পূর্ব এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্যের নতুন নতুন সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারে বেশি বেশি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি পাঠানোর দিকে সরকারকে অবিলম্বে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
রিপোর্টারের নাম 

























