ঢাকা ০৫:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর কষ্টের হিসাব কোথায়

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অভিবাসী উৎসদেশ এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্সগ্রাহী দেশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড। তবে অর্থনীতির এই উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব কান্না, একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও অসংখ্য ত্যাগের করুণ গল্প। রাষ্ট্র প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স-যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, তাদের জীবনের প্রকৃত মানবিক মূল্য বা ‘সোশ্যাল কস্ট অব মাইগ্রেশন’ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এখনো অত্যন্ত সীমিত।

প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো দীর্ঘ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকার ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়, আবার দাম্পত্য সম্পর্কেও ফাটল ধরে। এছাড়া, অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক সীমিত আয়ে বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান, কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর তৈরি হয় আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় প্রবাসীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে, যার অধিকাংশই ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণ। এটি প্রবাসীদের জীবনঝুঁকি ও স্বাস্থ্যগত সংকটের একটি ভয়াবহ চিত্র।

রেমিট্যান্সের টাকার বড় একটি অংশ দেশে জমি কেনা বা বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যয় হয়। কিন্তু মালিক প্রবাসে থাকায় প্রায়ই নিজের আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালী মহলের দ্বারা জমি দখল ও জালিয়াতির শিকার হন প্রবাসী। ফলে বিদেশ থেকে উপার্জনের পাশাপাশি দেশে ফিরে আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর মামলা লড়তে গিয়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অভিবাসী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে সেভাবে আসেনি। দীর্ঘ একাকিত্ব, পারিবারিক সংকট ও অনিশ্চয়তা অনেককে গভীর বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ সমাজ মনে করে বিদেশে থাকা মানেই ভালো থাকা।

প্রবাসীদের এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কেবল রেমিট্যান্সের হিসাব না করে প্রবাসীদের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক পরিকল্পনা, পারিবারিক যোগাযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, সহজলভ্য আইনি সহায়তা এবং দেশে থাকা পরিবারের জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি। কারণ, কোনো দেশের প্রকৃত সম্পদ কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয়, বরং তার মানুষ; আর সেই মানুষের জীবনের মূল্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

আইফোনের মেইল অ্যাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় আপডেট, কাজের গতি বাড়বে বহুগুণ

রেমিট্যান্সের হিসাব আছে, প্রবাসীর কষ্টের হিসাব কোথায়

আপডেট সময় : ০৪:২১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অভিবাসী উৎসদেশ এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে অষ্টম বৃহত্তম রেমিট্যান্সগ্রাহী দেশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে রেকর্ড। তবে অর্থনীতির এই উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নীরব কান্না, একাকিত্ব, মানসিক চাপ ও অসংখ্য ত্যাগের করুণ গল্প। রাষ্ট্র প্রবাসীদের ‘রেমিট্যান্স-যোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, তাদের জীবনের প্রকৃত মানবিক মূল্য বা ‘সোশ্যাল কস্ট অব মাইগ্রেশন’ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এখনো অত্যন্ত সীমিত।

প্রবাসজীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা হলো দীর্ঘ পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা। বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকার ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়, আবার দাম্পত্য সম্পর্কেও ফাটল ধরে। এছাড়া, অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক সীমিত আয়ে বিদেশের প্রতিকূল পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য অর্থ পাঠান, কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর তৈরি হয় আকাশচুম্বী প্রত্যাশার চাপ। এই অতিরিক্ত প্রত্যাশা অনেক সময় প্রবাসীর জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৮ হাজার প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে, যার অধিকাংশই ৪০ বছরের কম বয়সী তরুণ। এটি প্রবাসীদের জীবনঝুঁকি ও স্বাস্থ্যগত সংকটের একটি ভয়াবহ চিত্র।

রেমিট্যান্সের টাকার বড় একটি অংশ দেশে জমি কেনা বা বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যয় হয়। কিন্তু মালিক প্রবাসে থাকায় প্রায়ই নিজের আত্মীয়স্বজন বা প্রভাবশালী মহলের দ্বারা জমি দখল ও জালিয়াতির শিকার হন প্রবাসী। ফলে বিদেশ থেকে উপার্জনের পাশাপাশি দেশে ফিরে আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর মামলা লড়তে গিয়ে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অভিবাসী শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখনো আমাদের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে সেভাবে আসেনি। দীর্ঘ একাকিত্ব, পারিবারিক সংকট ও অনিশ্চয়তা অনেককে গভীর বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, অথচ সমাজ মনে করে বিদেশে থাকা মানেই ভালো থাকা।

প্রবাসীদের এই সংকট উত্তরণে রাষ্ট্র ও সমাজকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। কেবল রেমিট্যান্সের হিসাব না করে প্রবাসীদের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক পরিকল্পনা, পারিবারিক যোগাযোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি, সহজলভ্য আইনি সহায়তা এবং দেশে থাকা পরিবারের জন্য কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা সময়ের দাবি। কারণ, কোনো দেশের প্রকৃত সম্পদ কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নয়, বরং তার মানুষ; আর সেই মানুষের জীবনের মূল্য ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।