বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশে আসার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও দ্রুত করতে নতুন ভিসানীতি চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গত দুই দশকের পুরোনো ব্যবস্থা পরিবর্তন করে বিদেশিদের আগমন ও প্রস্থানকে আরও নিরাপত্তানির্ভর করতে ভিসানীতি দুই হাজার ছাব্বিশ প্রণয়ন করা হচ্ছে। গত দুই জুলাই সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নতুন ভিসানীতির খসড়া নিয়ে আলোচনা করা হয়। খসড়াটি আরও কার্যকর করতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে যেখানে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে এই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য শুধু বিদেশিদের ভিসা দেওয়াই নয় বরং বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য একটি আধুনিক অভিবাসন কাঠামো তৈরি করা। এর পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের বিষয়গুলোও খসড়া নীতিমালায় নিশ্চিত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি সাংবাদিকদের জানান যে দুই হাজার ছয় সালের পর প্রায় বিশ বছর পর এই নতুন ভিসানীতি করা হচ্ছে। পুরোনো ব্যবস্থায় ভিসা পেতে যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল তা দূর করে বিদেশিদের দ্রুত বাংলাদেশে আসার সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার। আগে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশ বাংলাদেশিদের যে ধরনের ভিসা দিত তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এখন অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে সরকার বিনিয়োগবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান বিদেশ থেকে যত বেশি বিনিয়োগ আসবে দেশের অর্থনীতির জন্য তা ততই লাভজনক হবে।
নতুন এই খসড়ায় মোট চৌত্রিশ ধরনের ভিসা ক্যাটাগরি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কূটনীতিক থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী এবং বিদেশি কর্মী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের জন্য আলাদা ক্যাটাগরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা এই খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। ব্যবসা ভিসার আওতায় আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা যাচাই এবং বাণিজ্য মেলাসহ অন্যান্য কাজে এক বছরের জন্য একাধিকবার প্রবেশের সুযোগ পাবেন এবং প্রতিবার নব্বই দিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবেন যা পরে নির্দিষ্ট শর্তে দুই বছর পর্যন্ত বাড়ানো যাবে। পাশাপাশি একক বা যৌথ উদ্যোগের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাইভেট ইনভেস্টর ভিসার প্রস্তাব করা হয়েছে যা প্রথম দফায় এক বছরের জন্য দেওয়া হলেও পরে তা পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে। কমপক্ষে পঞ্চাশ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে নো ভিসা রিকোয়ার্ড সুবিধাও পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিদেশি দক্ষ কর্মী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্যও খসড়ায় ই টু নামে আলাদা ভিসা ক্যাটাগরি রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো সংশ্লিষ্ট সংস্থার সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে আসা ভিসাধারীদের দেশে পৌঁছানোর পনেরো কর্মদিবসের মধ্যে কাজের অনুমতির জন্য আবেদন করতে হবে। অন্যদিকে ব্যবসা বা পর্যটন ভিসায় এসে দেশে কর্মসংস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। পর্যটকদের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস মেয়াদি ভিসার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য ত্রিশ দিনের অন অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ রাখা হয়েছে। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম কর্মীদের জন্যও আলাদা ক্যাটাগরির ভিসা থাকছে।
ভবিষ্যতের ডিজিটাল ভিসা কাঠামো তৈরির অংশ হিসেবে এই খসড়ায় ই ভিসা ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে। তবে বর্তমানে মেশিন রিডেবল ভিসা বাধ্যতামূলক থাকছে এবং ই ভিসা পুরোপুরি চালু হতে আরও সময় লাগবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিসা সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করবে এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলো ভিসা ইস্যুর দায়িত্বে থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে এই নতুন ভিসানীতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং শক্তিশালী ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান জানিয়েছেন যে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামতের ভিত্তিতে খুব শিগগিরই এই নতুন ভিসানীতির চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারিত হবে।
রিপোর্টারের নাম 























