ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পলাশীর ট্র্যাজেডি: নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাত ও বাংলার স্বাধীনতা হারানোর শোকগাথা

১৭৫৭ সালের ২ জুলাই, এই দিনটি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাত দিবস হিসেবে চিহ্নিত। এই তারিখে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলি খানের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নামক এক বিশ্বাসঘাতক নির্মমভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কেবল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতাই বিলুপ্ত হয়নি, বরং এর ধারাবাহিকতায় সমগ্র ভারতবর্ষই তার স্বাধীনতা হারায়। ধীরে ধীরে যুদ্ধ ও চক্রান্তের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে নেয়।

এর আগে, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত এক যুদ্ধে নিজস্ব লোকজনের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং বাংলা হারায় তার সার্বভৌমত্ব। মীর জাফর, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মীর কাসিম এবং জগৎ শেঠদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মূল কারণ ছিল। পলাশীর যুদ্ধে কতটা বেইমানি হয়েছিল, তা নবাবের সেনাবাহিনী ও ইংরেজ সৈন্যসংখ্যার তালিকা দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার, যার মধ্যে ৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী এবং ৫৩টি কামান ছিল। অন্যদিকে, লর্ড ক্লাইভের অধীনে ছিল মাত্র তিন হাজার সিপাহি, যার মধ্যে ২ হাজার ২০০ সিপাহি ও ৮০০ অশ্বারোহী ছিল। এই বিশাল বৈষম্য সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের কারণেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং বাংলা তার স্বাধীনতা হারায়।

পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলেও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পুনরায় যুদ্ধ প্রস্তুতিতে সৈন্য সংগ্রহের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মুর্শিদাবাদে ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। মীর জাফর, জগৎ শেঠ ও রাজবল্লভরা কেবল সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা নবাবের ছোট ভাই মির্জা মেহেদীকেও কাঠচাপা দিয়ে হত্যা করে। তখন মির্জা মেহেদীর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।

সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর তার স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেসা, সিরাজমাতা আমিনা বেগম, নানি শরফুন্নেসা, সিরাজের চার বছরের মেয়ে উম্মে জোহরা এবং খালা ঘসেটি বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরা কারাগারে পাঠানো হয় মীর জাফর-জগৎ শেঠচক্রের নির্দেশে। এরপর ১৭৮০ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে নেওয়ার কথা বলে নৌকায় তোলা হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের সদস্যদের, যাদের ভাগ্যে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সোনালু: গ্রীষ্মের রুক্ষতায় এক পশলা সোনালি সৌন্দর্যের ছোঁয়া

পলাশীর ট্র্যাজেডি: নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাত ও বাংলার স্বাধীনতা হারানোর শোকগাথা

আপডেট সময় : ০১:৪৬:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

১৭৫৭ সালের ২ জুলাই, এই দিনটি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাহাদাত দিবস হিসেবে চিহ্নিত। এই তারিখে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভ এবং নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলি খানের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নামক এক বিশ্বাসঘাতক নির্মমভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে কেবল বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীনতাই বিলুপ্ত হয়নি, বরং এর ধারাবাহিকতায় সমগ্র ভারতবর্ষই তার স্বাধীনতা হারায়। ধীরে ধীরে যুদ্ধ ও চক্রান্তের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষ দখল করে নেয়।

এর আগে, ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আমবাগানে সংঘটিত এক যুদ্ধে নিজস্ব লোকজনের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং বাংলা হারায় তার সার্বভৌমত্ব। মীর জাফর, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ, উমিচাঁদ, মীর কাসিম এবং জগৎ শেঠদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মূল কারণ ছিল। পলাশীর যুদ্ধে কতটা বেইমানি হয়েছিল, তা নবাবের সেনাবাহিনী ও ইংরেজ সৈন্যসংখ্যার তালিকা দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার, যার মধ্যে ৩৫ হাজার পদাতিক, ১৫ হাজার অশ্বারোহী এবং ৫৩টি কামান ছিল। অন্যদিকে, লর্ড ক্লাইভের অধীনে ছিল মাত্র তিন হাজার সিপাহি, যার মধ্যে ২ হাজার ২০০ সিপাহি ও ৮০০ অশ্বারোহী ছিল। এই বিশাল বৈষম্য সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের কারণেই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে এবং বাংলা তার স্বাধীনতা হারায়।

পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হলেও নবাব সিরাজউদ্দৌলা পুনরায় যুদ্ধ প্রস্তুতিতে সৈন্য সংগ্রহের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি শত্রুদের হাতে ধরা পড়েন। পরবর্তীতে ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই মুর্শিদাবাদে ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয়। মীর জাফর, জগৎ শেঠ ও রাজবল্লভরা কেবল সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা নবাবের ছোট ভাই মির্জা মেহেদীকেও কাঠচাপা দিয়ে হত্যা করে। তখন মির্জা মেহেদীর বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।

সিরাজউদ্দৌলার হত্যার পর তার স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেসা, সিরাজমাতা আমিনা বেগম, নানি শরফুন্নেসা, সিরাজের চার বছরের মেয়ে উম্মে জোহরা এবং খালা ঘসেটি বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরা কারাগারে পাঠানো হয় মীর জাফর-জগৎ শেঠচক্রের নির্দেশে। এরপর ১৭৮০ সালে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে নেওয়ার কথা বলে নৌকায় তোলা হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরিবারের সদস্যদের, যাদের ভাগ্যে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ।