ঢাকা ০২:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

কুয়াকাটা উপকূলে অবৈধ ট্রলিংয়ের তাণ্ডব: ধ্বংসের মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, সংকটে হাজারো জেলে

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী মৎস্যবন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ দৌরাত্ম্য। প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব বোট উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মৎস্যসম্পদকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়ার বাচ্চা ও চিংড়ির পোনা নিধন করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রজননব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদনে। এমন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার প্রান্তিক জেলে চরম জীবিকার সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত বছর মহিপুর-আলিপুর এলাকায় যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল, চলতি বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। দ্রুত অধিক মুনাফার লোভে প্রতিনিয়ত সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, বিশাল আকৃতির এই ট্রলিং বোটগুলোর গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু আইন অমান্য করে এগুলো উপকূলের মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এসব বোটে ব্যবহৃত ভারী জাল বা ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে টেনে নেওয়ার কারণে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের অভয়াশ্রম বা বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মহিপুর ও আলিপুর বন্দরের সাধারণ জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা ছোট নৌকা ও ট্রলার নিয়ে যেখানে মাছ ধরেন, সেখানেই এই বড় ট্রলিং বোটগুলো এসে জাল ফেলে। প্রায়শই বড় বোটগুলো ক্ষুদ্র জেলেদের জালের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা আরও জানান, এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বাঁশখালীতে ৩১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: ৭৩ বিনিয়োগকারীর অভিযোগে লাপাত্তা ওয়াহিদুল

কুয়াকাটা উপকূলে অবৈধ ট্রলিংয়ের তাণ্ডব: ধ্বংসের মুখে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, সংকটে হাজারো জেলে

আপডেট সময় : ১২:৩৪:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী মৎস্যবন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ দৌরাত্ম্য। প্রচলিত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব বোট উপকূলের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মৎস্যসম্পদকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়ার বাচ্চা ও চিংড়ির পোনা নিধন করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রজননব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদনে। এমন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার প্রান্তিক জেলে চরম জীবিকার সংকটে পড়েছেন।

স্থানীয় জেলে, মৎস্য ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত বছর মহিপুর-আলিপুর এলাকায় যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল, চলতি বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। দ্রুত অধিক মুনাফার লোভে প্রতিনিয়ত সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।

সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, বিশাল আকৃতির এই ট্রলিং বোটগুলোর গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু আইন অমান্য করে এগুলো উপকূলের মাত্র কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এসব বোটে ব্যবহৃত ভারী জাল বা ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য এক ভয়াবহ অভিশাপ। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে টেনে নেওয়ার কারণে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের অভয়াশ্রম বা বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

মহিপুর ও আলিপুর বন্দরের সাধারণ জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা ছোট নৌকা ও ট্রলার নিয়ে যেখানে মাছ ধরেন, সেখানেই এই বড় ট্রলিং বোটগুলো এসে জাল ফেলে। প্রায়শই বড় বোটগুলো ক্ষুদ্র জেলেদের জালের ওপর দিয়ে চলে যায়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে নষ্ট হয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা আরও জানান, এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।