তুরাগ নদে পুলিশি ধাওয়ার মুখে কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকে পুলিশ ‘ভিত্তিহীন’ বলছে। তবে ঘটনাস্থলের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের দাবি, গত ২২ জুন আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন তুরাগ নদে পুলিশের ধাওয়ার সময় একটি ট্রলার থেকে কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দেন। পরে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পুলিশ আটক করে এবং অন্যদের খোঁজে ঘটনাস্থলে তৎপরতাও চালায়।
অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য, সেদিন নদীতে ধাওয়া বা নিখোঁজ হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তাদের দাবি, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একটি মিছিল থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
লাশ উদ্ধারের পর নতুন প্রশ্ন
ঘটনার পর ২৪ ও ২৬ জুন তুরাগ নদ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব মৃত্যুর সঙ্গে ২২ জুনের ঘটনার যোগসূত্র টানা হলেও পুলিশ তা নাকচ করেছে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর একটি তুরাগের রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী মো. সুমনের।
আশুলিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, সুমন বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে ট্রলার থেকে নামার সময় নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
তবে সুমনের খালু জুয়েল বাবু বলেন, পরিবার কখনো পুলিশকে পিকনিকে যাওয়ার কথা বলেনি। তিনি জানান, নিখোঁজের খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে পেলেও ধাওয়া বা নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার বিষয়ে তাদের কিছু জানানো হয়নি।
তার দাবি, পরে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ গ্রহণের সময় পরিবারের সদস্যদের একটি কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
পুলিশের বক্তব্য
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আজগর হোসেন বলেন, অপমৃত্যু মামলার এজাহারে বাদী যে তথ্য দিয়েছেন, তার ভিত্তিতেই পুলিশ পিকনিকে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।
তিনি বলেন, “বাদীর এজাহারে যা আছে, আমরা সেটাই বলেছি।”
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন কোনো তথ্য তিনি পাননি।
এর আগে পুলিশ সদরদপ্তরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘সাতজনের মৃত্যু’ সংক্রান্ত তথ্যকে গুজব বলে উল্লেখ করেছে।
ঢাকার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনও বলেছেন, তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ঘটনার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন। তার দাবি, তুরাগ থানা এলাকায় ধারাবাহিকভাবে মরদেহ উদ্ধারের মতো কোনো রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন
ঘটনাস্থলে কথা হয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে। তাদের দাবি, ২২ জুন দুপুরের দিকে আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন পন্টুনে একটি ট্রলার ভিড়তেই বাজারের দিক থেকে পুলিশ ও সাদা পোশাকধারী কয়েকজন দৌড়ে আসেন।
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য, ট্রলারটিতে ৩০ থেকে ৪০ জন ছিলেন। পুলিশ ধাওয়া দিলে কয়েকজন তীরে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং আরও কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দেন।
আরেকজনের দাবি, নদীতে ভেসে যাওয়া কয়েকজনকে স্থানীয়রা টেনে তুললেও পরে পুলিশ আবার তাদের আটক করে। তবে কতজন শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ হন, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পরদিনও নদীর তীরে পুলিশ অবস্থান নেয় এবং পরবর্তী দুই দিন কয়েকটি পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে নদীতে ঘুরেছেন।
নিখোঁজদের পরিবার কী বলছে?
সুমনের খালু জুয়েল বাবুর দাবি, সুমন ২২ জুন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি।
পরিবার প্রথমে ধারণা করেছিল, তিনি হয়তো গ্রেপ্তার হয়েছেন। পরে নিজেরাই ট্রলার নিয়ে নদীতে খোঁজাখুঁজি করেন। ২৬ জুন রাতে পুলিশ তাদের একটি মরদেহ শনাক্ত করতে ডাকে, যা পরে সুমনের বলে নিশ্চিত হয়।
তিনি দাবি করেন, পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে পিকনিকে যাওয়ার কোনো তথ্য দেননি।
একইভাবে আরিফ হাসান রাকিব নামে আরেক ব্যক্তির স্বজনরাও জানান, তিনি ২২ জুন নিখোঁজ হন এবং পরে নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।
তদন্তের দাবি
ঘটনার বর্ণনায় বেশ কিছু অসামঞ্জস্য থাকায় স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
তার মতে, যদি সত্যিই পুলিশি ধাওয়ার অভিযোগ থাকে, তাহলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে স্বাধীন বা বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “কে কী পরিস্থিতিতে নদীতে পড়েছে, কেউ নিখোঁজ হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর নিরপেক্ষ তদন্তেই পরিষ্কার হতে পারে।”
এদিকে পুলিশ এখন পর্যন্ত দাবি করে আসছে, তাদের কাছে নদীতে ধাওয়া দিয়ে কাউকে ফেলে দেওয়ার বা রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে মরদেহ উদ্ধারের কোনো প্রমাণ নেই। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ও কয়েকটি পরিবারের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। ফলে ২২ জুন তুরাগ নদে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
রিপোর্টারের নাম 
























