বিশ্ববাজারে ভারতীয় আমের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বাংলাদেশের জন্য নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। জাপান ও নেপালের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে ভারতীয় আমের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি অবকাঠামো উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের আম রপ্তানি কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব।
সম্প্রতি ভারতের পরিবেশবিষয়ক সাময়িকী ডাউন টু আর্থ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ফিউমিগেশন ও জীবাণুমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় ত্রুটি এবং কীটনাশকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের অভিযোগে ভারতীয় আম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। গত মার্চে জাপান ভারত থেকে আম আমদানি স্থগিত করে। একই সময়ে নেপালও আমদানির ক্ষেত্রে কঠোর উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য শর্ত আরোপ করে।
বিশ্বের বৃহত্তম আম উৎপাদক দেশ ভারত বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টন আম উৎপাদন করে। যদিও মোট উৎপাদনের এক শতাংশেরও কম রপ্তানি হয়, তবুও সেই পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টনের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় আমের অবস্থান শক্তিশালী হলেও সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির রপ্তানি খাতকে চাপে ফেলেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশেও প্রতিবছর ২৫ থেকে ২৮ লাখ টন আম উৎপাদন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ মৌসুমে দেশে সর্বোচ্চ ২৮ লাখ ৬৭ হাজার ৬৭৮ টন আম উৎপাদিত হয়। কিন্তু উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানি এখনো খুবই সীমিত। ওই মৌসুমে মাত্র ৩ হাজার ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানি করা হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদনের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি হার মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ, যা ভারতের তুলনায়ও অনেক কম। ফলে বিশ্ববাজারে নতুন সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে হলে রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের আম ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ ৩৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, দেশের আমের বাজারমূল্য ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যথাযথ রপ্তানি নীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে এই বাজার ২৫ হাজার কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভারতীয় আম নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে জাপান ও মালয়েশিয়ার বাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে দেশের বিভিন্ন আমবাগান পরিদর্শন করেছে। তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে আম আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল ট্রেড লিংক’-এর কর্ণধার রাজিয়া সুলতানা বলেন, মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের আমের গুণগত মান এবং কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিগগিরই দেশটিতে বাংলাদেশের আম রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
একইভাবে জাপানের বাজারেও প্রবেশের চেষ্টা চলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন’ প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান জানান, জাপানের অন্যতম শর্ত ছিল ভ্যাপর হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি) প্ল্যান্ট স্থাপন, যা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস (পিআরএ) সংক্রান্ত কিছু কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় আমের সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, আকাশপথে পণ্য পরিবহনের উচ্চ ব্যয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজিয়া সুলতানা অভিযোগ করেন, সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পূর্বঘোষণা ছাড়াই কার্গো ভাড়া কেজিপ্রতি ৪১ টাকা বাড়িয়েছে। আগে যেখানে ভাড়া ছিল ৪৯০ টাকা, এখন তা ৫৩১ টাকায় উন্নীত হয়েছে। এর ফলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর ভাড়াও বেড়েছে।
তিনি বলেন, আমের উৎপাদন, প্যাকেজিং, শ্রম ও সংরক্ষণ ব্যয়ের সঙ্গে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। সরকার যদি রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যের জন্য বিশেষ কার্গো সুবিধা ও ভর্তুকি দেয়, তাহলে বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় আমের রপ্তানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি হোক বা সাময়িক, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি কৌশলগত সুযোগ। এখন প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সম্ভাবনাময় বাজারগুলোতে সক্রিয় বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করা। এসব উদ্যোগ সফল হলে দেশের আম রপ্তানি খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় উৎসে পরিণত হতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























