বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, আন্তর্জাতিক সহায়তার তহবিল ঘাটতি অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল ও গভীর আকার ধারণ করতে পারে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং নিরাপত্তাসহ মৌলিক সেবাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর জানায়, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে একাধিক মানবিক সংকট এবং দাতা দেশগুলোর বাজেট সংকোচনের কারণে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান, সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখে লাখো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও নতুন করে রোহিঙ্গাদের আগমন অব্যাহত থাকে। বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত।
ইউএনএইচসিআর বলছে, দীর্ঘ নয় বছর ধরে চলমান এই সংকটে আশ্রিত জনগোষ্ঠীর জীবনধারণ সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো এখন মৌলিক সেবাগুলো বজায় রাখতেই হিমশিম খাচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারে নতুন করে সহিংসতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এতে শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়েছে এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে বাড়তি জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ যৌথভাবে রোহিঙ্গাদের খাদ্য, বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের মানবিক সহায়তা তহবিলের আবেদন জানায়। তবে এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এ বছরের আবেদনকৃত অর্থের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম ছিল। তারপরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র Babar Baloch বলেছেন, রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ যেন বিশ্ব ভুলে না যায়। তার মতে, কয়েক দশক ধরে নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতির শিকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু এত বড় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতা অপরিহার্য।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলো ইতোমধ্যে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। সেখানে চরম আবহাওয়া, অগ্নিকাণ্ড, রোগব্যাধি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সীমিত সেবার কারণে বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন।
জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাবর বালোচ আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহায়তা অব্যাহত না থাকলে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর দুর্দশা আরও বাড়বে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মানবিক সংকট ও সংঘাতের কারণে সহায়তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে গিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা হুমকির মুখে পড়ছে।
মানবাধিকার ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের চাপ শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতেও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী আগস্টে রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তহবিল সংকটের সতর্কবার্তা শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 



















