মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করেছেন দুই দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এই সমঝোতা স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার এক নতুন পথ খুলে দিতে পারে। তবে এই চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার জন্য এখনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও সবুজ সংকেতের প্রয়োজন রয়েছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দুই দেশের মধ্যকার অচল ও থমকে থাকা কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে এই নতুন সমঝোতাটিকে একটি মস্ত বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই প্রস্তাবিত চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিস্তারিত শর্তাবলি এখনো উভয় পক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি এবং ৬০ দিনের এই বর্ধিত সময়সীমা আলোচনার শেষ সময় কি না, সেটিও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
এর আগে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ও আকস্মিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল, যা চলমান যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়ার এক তীব্র আশঙ্কা তৈরি করে। badminton খেলা বা অন্য যেকোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতির চেয়েও এই সামরিক উত্তেজনা ছিল চরমে, যার প্রমাণ হিসেবে সমঝোতার খবর আসার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারও উভয় পক্ষ সীমিত আকারে একে অপরের ওপর সামরিক হামলা চালিয়েছে। মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম এই চাঞ্চল্যকর সমঝোতার খবরটি প্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসও আল জাজিরার কাছে এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। অ্যাক্সিওসের বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত খসড়া চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চল হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রাখার কথা জোরালোভাবে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়টিও এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা চলছে। তেহরানের দীর্ঘদিনের দাবি হলো, এই প্রণালিটি যেহেতু ইরান ও ওমানের জলসীমার একেবারে মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, সেহেতু এটি দুই দেশের মাধ্যমে যৌথভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত। তবে বাণিজ্যের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই এ ধরনের একক বা যৌথ নিয়ন্ত্রণ অথবা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে যেকোনো ধরনের টোল বা ফি আদায়ের উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। এই রেশ ধরেই বৃহস্পতিবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ওমান সরকারকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ওমান যদি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের এই ফি বা টোল আরোপের উদ্যোগে কোনো ধরনের সহায়তা করে, তাহলে ওমানের বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন অর্থমন্ত্রী বেসেন্ট স্পষ্ট করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান এই বিষয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার; ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে, তাদের উৎপাদিত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে এবং সামগ্রিক পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
তবে পশ্চিমাদের এই ব্যাপক প্রচারণার বিপরীতে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ এই যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার খবরটিকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। আলোচনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট তেহরানের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে এই চুক্তি চূড়ান্ত হলে ইরান সরকার নিজেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববাসীকে তা জানাবে, এর আগে পশ্চিমা গণমাধ্যমের ছড়ানো কোনো ধরনের দাবি বা খবর গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির খসড়ায় ইরানের পক্ষ থেকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র না তৈরির প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ রয়েছে। যদিও তেহরান শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাবি করে আসছে যে, তারা কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না। বর্তমান যুদ্ধের শুরুতে নিহত হওয়া ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও বহু বছর আগে গণবিধ্বংসী ও পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ফতোয়া দিয়েছিলেন। ইরানের বর্তমান ও দায়িত্বরত প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার আবারও দৃঢ়তার সাথে বলেন যে, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের পথে হাঁটছে না এবং তারা কখনোই পশ্চিমাদের কোনো অপমানজনক কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না। তবে ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ ইস্যুতে সাময়িক সমাধান এলেও ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়াম মজুত হ্রাস ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মতো বড় বড় অমীমাংসিত বিষয়গুলো এখনো দুই দেশের মধ্যে বড় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে।
একই সময়ে লেবানন পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও যুদ্ধমুখী হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্থল ও বিমান হামলা বহুগুণ জোরদার করেছে এবং এর জবাবে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার দীর্ঘ তিন সপ্তাহ পর আবারও লেবাননের রাজধানী বৈরুতে তীব্র বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স, যা গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর রাজধানীতে তাদের দ্বিতীয় বড় হামলা। এই বিষয়ে ইরান আগেই বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের যেকোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে অবশ্যই লেবানন ও হিজবুল্লাহর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। অন্যদিকে, লেবাননের বর্তমান সরকারও দেশে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চিরতরে বন্ধের লক্ষ্যে পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 
























