ঢাকা ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২৬

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টিটিপি ছায়া, নতুন নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ

কক্সবাজারের টেকনাফে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক রোহিঙ্গা তরুণ গ্রেফতারের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। টেকনাফের ২৪ নম্বর জাদিমুড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গত ৪ মে রাতে মোহাম্মদ উল্যাহ (১৯) নামের ওই তরুণকে আটক করা হয়। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে টিটিপি-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার দেখানো হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে টিটিপির সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং সেখানে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদান হতো। বর্তমানে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও তা গভীর উদ্বেগের কারণ। কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে এবং উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী জীবন, কর্মসংস্থানের অভাব, হতাশা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে কিছু তরুণ চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি টিটিপি বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ক্যাম্পের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তবে তা শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, পুরো সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া তরুণ অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষ। তার মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং আরও কেউ এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। টেকনাফ থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রুপটির প্রশাসকরা বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং আরও রোহিঙ্গা সদস্য জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, যেকোনো উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবিলায় তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেশের সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। তার মতে, গ্রেফতার হওয়া তরুণের সঙ্গে অন্যদের যোগাযোগ ছিল কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে এবং সহায়তা যত কমবে, ততই নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। তাই মানবিক সংকটের পাশাপাশি বিষয়টিকে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের প্রথম দিনেই সাভার ট্যানারিতে প্রবেশ করলো ২ লক্ষাধিক কাঁচা চামড়া

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টিটিপি ছায়া, নতুন নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ১১:০০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৩ মে ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে এক রোহিঙ্গা তরুণ গ্রেফতারের ঘটনা দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। টেকনাফের ২৪ নম্বর জাদিমুড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গত ৪ মে রাতে মোহাম্মদ উল্যাহ (১৯) নামের ওই তরুণকে আটক করা হয়। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে টিটিপি-সংশ্লিষ্ট যোগাযোগের তথ্য পাওয়ার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার দেখানো হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তিনি একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে টিটিপির সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন এবং সেখানে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় বিভিন্ন বার্তা আদান-প্রদান হতো। বর্তমানে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন হলেও তা গভীর উদ্বেগের কারণ। কারণ বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে এবং উখিয়া-টেকনাফের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা শরণার্থী শিবিরগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার, অপহরণ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী জীবন, কর্মসংস্থানের অভাব, হতাশা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে কিছু তরুণ চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যদি টিটিপি বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ক্যাম্পের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়, তবে তা শুধু রোহিঙ্গা শিবির নয়, পুরো সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, গ্রেফতার হওয়া তরুণ অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ে দক্ষ। তার মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং আরও কেউ এ নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। টেকনাফ থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রুপটির প্রশাসকরা বাংলাদেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং আরও রোহিঙ্গা সদস্য জড়িত থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক গোয়েন্দা তৎপরতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, যেকোনো উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবিলায় তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দেশের সাধারণ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি জটিল। তার মতে, গ্রেফতার হওয়া তরুণের সঙ্গে অন্যদের যোগাযোগ ছিল কি না, তা দ্রুত তদন্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোরও প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে এবং সহায়তা যত কমবে, ততই নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। তাই মানবিক সংকটের পাশাপাশি বিষয়টিকে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।