ঢাকা ০২:১৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬

বান্দরবানে প্রশাসনের অভিযানের পরও পাড়াবনের কাঠ লুট অব্যাহত

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা সংরক্ষিত একটি পাড়াবনের গাছ নিধন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও কাঠ পাচার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে গত এক সপ্তাহ ধরে বনাঞ্চলে আগে থেকে কেটে রাখা গাছগুলো রাতের আঁধারে ট্রাকে করে পাচার করা হচ্ছে। আলীকদম থানচি সড়কের তেইশ কিলো এলাকায় ম্রো সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত এই পাড়াবনের গাছ গত দুই বছর ধরে অবৈধভাবে কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন আলীকদমের জনৈক এক কাঠ ব্যবসায়ী।

বিষয়টি নিয়ে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন এবং বনবিভাগ যৌথভাবে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। সেই সফল অভিযানে তিনশো ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয় এবং পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি এক্সক্যাভেটর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অবৈধ এই গাছ ব্যবসায়ী আবু হান ইসমাইলের বিরুদ্ধে বনবিভাগের পক্ষ থেকে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কেটে রাখা বেশ কিছু গাছ পুড়িয়ে দেয়।

তবে প্রশাসনের এতসব কড়াকড়ির আঠারো থেকে বিশ দিন পার হতে না হতেই পুনরায় পাড়াবনে অনুপ্রবেশ করে কেটে রাখা গাছগুলো রাতের বেলায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বিস্তারিত জানিয়ে বলেন আগে কাঠ পাচারকারীরা ইলেকট্রিক করাত ব্যবহার করে পাড়াবনের গাছ কেটে স্তূপ করে রাখত এবং প্রতিদিন বড় ট্রাকে করে সেগুলো আলীকদমে নিয়ে যেত। সাংবাদিকদের সংবাদের জেরে প্রশাসনের অভিযানের পর কিছুদিন এই কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে পুনরায় রাতের আঁধারে কাঠ পাচার শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রকাশ্যেই দিনে দুপুরে চলছে।

তিনি আরও জানান রবিবার বিকালেও একসঙ্গে দুটি ট্রাক বনাঞ্চলে ঢুকেছে এবং সকাল থেকে সারাদিন ধরে তারা গাছ সরিয়েছে। বিষয়টি আলীকদমের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও এবং আলীকদম সেনা জোনকে অবহিত করা হলেও তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রবিবার বিকালে ইউএনওর সাথে কথা বললে তিনি জানান আলীকদমে স্থানীয় সংসদ সদস্য অবস্থান করায় তিনি তাকে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে লামা বনবিভাগের চৈক্ষ্যং রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলামকে একাধিকবার মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

সার্বিক বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো মনজুর আলম জানান রবিবার সকালে তিনি সেনাবাহিনীর সাথে কথা বলেছেন এবং তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে কাঠ পাচারকারীকে ধরার জন্য লোক নিয়োগ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন আলীকদম থানচি সড়কের ডিম পাহাড় এলাকার ছাব্বিশ কিলো ক্যাম্পে সেনা সদস্যের সংখ্যা কম থাকায় আলীকদম সদর থেকে টিম পাঠাতে কিছুটা সময় লাগছে তবে তাকে ধরার জন্য একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইউএনও দৃঢ়তার সাথে বলেন পাচারকারীকে ধরতে পারলে বনবিভাগের মামলার অপেক্ষায় না থেকে সরাসরি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এক থেকে দেড় বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে কারণ বনবিভাগের মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তেইশ কিলো এলাকাটি অনেক দূরে হওয়ায় সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন এবং তারা অভিযান চালালেই তিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পাহাড়িদের কোনো পাড়ার আশেপাশের অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলে নির্দিষ্ট একটি বড় এলাকা নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখাকে স্থানীয়ভাবে পাড়াবন রিজার্ভ বন বা পাড়াবাম বলা হয়। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারিরা এর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন এবং এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ সামাজিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর মালিকানাও সম্পূর্ণ সামাজিক। পাড়াবন সামাজিক মালিকানাধীন হলেও বনবিভাগের পূর্বানুমতি ছাড়া বড় গাছ কাটার কোনো নিয়ম নেই।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

লক্ষ্মীপুরে স্কুলছাত্রের মৃত্যু: অধ্যক্ষসহ ১৮ জনের নামে হত্যা মামলা

বান্দরবানে প্রশাসনের অভিযানের পরও পাড়াবনের কাঠ লুট অব্যাহত

আপডেট সময় : ০১:৪০:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা সংরক্ষিত একটি পাড়াবনের গাছ নিধন বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালানো হলেও কাঠ পাচার কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে গত এক সপ্তাহ ধরে বনাঞ্চলে আগে থেকে কেটে রাখা গাছগুলো রাতের আঁধারে ট্রাকে করে পাচার করা হচ্ছে। আলীকদম থানচি সড়কের তেইশ কিলো এলাকায় ম্রো সম্প্রদায়ের সংরক্ষিত এই পাড়াবনের গাছ গত দুই বছর ধরে অবৈধভাবে কেটে নিয়ে যাচ্ছিলেন আলীকদমের জনৈক এক কাঠ ব্যবসায়ী।

বিষয়টি নিয়ে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন এবং বনবিভাগ যৌথভাবে ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে। সেই সফল অভিযানে তিনশো ঘনফুট কাঠ জব্দ করা হয় এবং পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহৃত একটি এক্সক্যাভেটর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অবৈধ এই গাছ ব্যবসায়ী আবু হান ইসমাইলের বিরুদ্ধে বনবিভাগের পক্ষ থেকে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয় এবং পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কেটে রাখা বেশ কিছু গাছ পুড়িয়ে দেয়।

তবে প্রশাসনের এতসব কড়াকড়ির আঠারো থেকে বিশ দিন পার হতে না হতেই পুনরায় পাড়াবনে অনুপ্রবেশ করে কেটে রাখা গাছগুলো রাতের বেলায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে স্থানীয়রা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। উপজেলার চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া পাড়ার বাসিন্দা লাইরু ম্রো বিস্তারিত জানিয়ে বলেন আগে কাঠ পাচারকারীরা ইলেকট্রিক করাত ব্যবহার করে পাড়াবনের গাছ কেটে স্তূপ করে রাখত এবং প্রতিদিন বড় ট্রাকে করে সেগুলো আলীকদমে নিয়ে যেত। সাংবাদিকদের সংবাদের জেরে প্রশাসনের অভিযানের পর কিছুদিন এই কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও গত এক সপ্তাহ ধরে পুনরায় রাতের আঁধারে কাঠ পাচার শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে তা প্রকাশ্যেই দিনে দুপুরে চলছে।

তিনি আরও জানান রবিবার বিকালেও একসঙ্গে দুটি ট্রাক বনাঞ্চলে ঢুকেছে এবং সকাল থেকে সারাদিন ধরে তারা গাছ সরিয়েছে। বিষয়টি আলীকদমের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও এবং আলীকদম সেনা জোনকে অবহিত করা হলেও তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রবিবার বিকালে ইউএনওর সাথে কথা বললে তিনি জানান আলীকদমে স্থানীয় সংসদ সদস্য অবস্থান করায় তিনি তাকে নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে লামা বনবিভাগের চৈক্ষ্যং রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলামকে একাধিকবার মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

সার্বিক বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো মনজুর আলম জানান রবিবার সকালে তিনি সেনাবাহিনীর সাথে কথা বলেছেন এবং তারা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে কাঠ পাচারকারীকে ধরার জন্য লোক নিয়োগ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন আলীকদম থানচি সড়কের ডিম পাহাড় এলাকার ছাব্বিশ কিলো ক্যাম্পে সেনা সদস্যের সংখ্যা কম থাকায় আলীকদম সদর থেকে টিম পাঠাতে কিছুটা সময় লাগছে তবে তাকে ধরার জন্য একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইউএনও দৃঢ়তার সাথে বলেন পাচারকারীকে ধরতে পারলে বনবিভাগের মামলার অপেক্ষায় না থেকে সরাসরি মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে এক থেকে দেড় বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে কারণ বনবিভাগের মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তেইশ কিলো এলাকাটি অনেক দূরে হওয়ায় সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন এবং তারা অভিযান চালালেই তিনি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পাহাড়িদের কোনো পাড়ার আশেপাশের অশ্রেণিভুক্ত বনাঞ্চলে নির্দিষ্ট একটি বড় এলাকা নিয়ে বনভূমি সংরক্ষণ করে রাখাকে স্থানীয়ভাবে পাড়াবন রিজার্ভ বন বা পাড়াবাম বলা হয়। মৌজা প্রধান হেডম্যান ও গ্রামপ্রধান কারবারিরা এর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন এবং এই বনের প্রাকৃতিক সম্পদ সামাজিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর মালিকানাও সম্পূর্ণ সামাজিক। পাড়াবন সামাজিক মালিকানাধীন হলেও বনবিভাগের পূর্বানুমতি ছাড়া বড় গাছ কাটার কোনো নিয়ম নেই।