ঢাকা ০২:২১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

বেইজিংয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভিড়: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নাকি নিছক কৌশল?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘনঘন বেইজিং সফর কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কোনো দেশকেন্দ্রিক নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক কৌশলের এক সমন্বয়।

বিগত সরকারের পতনের পর থেকেই চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। এর ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করেন। এমনকি হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের মতো ইসলামি দলগুলোর নেতাদেরও আতিথেয়তা দিয়েছে চীন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এই সফরগুলোকে ‘ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, চীন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও সমাজের সব স্তরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক গভীর করতে চায়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল যাই হোক না কেন, চীন নিজেকে একটি ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ এবং ‘উন্নয়ন সহযোগী’ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া।

সফরগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের একটি ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী’ প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। এর বাইরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বেও একাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর এই সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ গ্রহণের পর দলটির ১৯ সদস্যের একটি বড় প্রতিনিধি দল বেইজিং সফর করে ‘এক চীন’ নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই তৎপরতার মূলে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। বাংলাদেশে চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে আরও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করতে তারা বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের প্রভাবে চীন অনেক প্রকল্প ও কাজের সুযোগ হারিয়েছিল, এখন তারা সেই শূন্যস্থান পূরণে সচেষ্ট।

আগামী ৫ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চীন সফরে যাচ্ছেন। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ঋণের শর্ত শিথিল এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রার্থিতার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলোর এই বেইজিং সফর কেবল সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব বিস্তারের এক সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সাগর-রুনি হত্যা: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় ১২৬ বার পেছালো

বেইজিংয়ে রাজনৈতিক নেতাদের ভিড়: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন সমীকরণ নাকি নিছক কৌশল?

আপডেট সময় : ০৪:৩০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতি ও কূটনীতিতে প্রতিবেশী ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব থাকলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীন অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ঘনঘন বেইজিং সফর কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কোনো দেশকেন্দ্রিক নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক কৌশলের এক সমন্বয়।

বিগত সরকারের পতনের পর থেকেই চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাত্র তিন মাসের মাথায় বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। এর ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করেন। এমনকি হেফাজতে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের মতো ইসলামি দলগুলোর নেতাদেরও আতিথেয়তা দিয়েছে চীন, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এই সফরগুলোকে ‘ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, চীন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল ও সমাজের সব স্তরের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক গভীর করতে চায়। অর্থাৎ, বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল যাই হোক না কেন, চীন নিজেকে একটি ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ এবং ‘উন্নয়ন সহযোগী’ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া।

সফরগুলোর চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের একটি ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী’ প্রতিনিধি দল চীন সফর করে। এর বাইরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বেও একাধিক সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর এই সম্পর্ক আরও জোরালো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান শপথ গ্রহণের পর দলটির ১৯ সদস্যের একটি বড় প্রতিনিধি দল বেইজিং সফর করে ‘এক চীন’ নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই তৎপরতার মূলে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ। বাংলাদেশে চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিনিয়োগের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে আরও বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি করতে তারা বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। সাবেক কূটনীতিকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের প্রভাবে চীন অনেক প্রকল্প ও কাজের সুযোগ হারিয়েছিল, এখন তারা সেই শূন্যস্থান পূরণে সচেষ্ট।

আগামী ৫ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চীন সফরে যাচ্ছেন। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই সফরে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ঋণের শর্ত শিথিল এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রার্থিতার বিষয়ে চীনের সমর্থন চাওয়া হতে পারে। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক দলগুলোর এই বেইজিং সফর কেবল সৌজন্য বিনিময় নয়, বরং বাংলাদেশের আগামীর রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব বিস্তারের এক সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।