ঢাকা ০১:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

এপ্রিলে রপ্তানি আয়ে বড় লাফ: টেকসই উন্নতি নাকি সাময়িক উল্লম্ফন?

দেশের রপ্তানি খাতে দীর্ঘ আট মাসের মন্দা কাটিয়ে এপ্রিলে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির দেখা মিলেছে। তবে এই উল্লম্ফন স্থায়ী কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার কারণে নয়, বরং মার্চ মাসের জমে থাকা শিপমেন্ট বা চালান এপ্রিলে সম্পন্ন হওয়ার একটি গাণিতিক ফলাফল মাত্র।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের রপ্তানি আয় বছরওয়ারি হিসেবে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই মাসে যা ছিল ৩০০ কোটি ডলার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করেই এই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার লক্ষ্য করা গেছে। তবে জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে সামগ্রিক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কমে ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ইপিবি এই প্রবৃদ্ধিকে বৈশ্বিক বাজারের নবোদ্যম এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দাবি করলেও তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা ভিন্ন কথা বলছেন। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় অনেক পণ্য জাহাজীকরণ করা সম্ভব হয়নি। সেই জমে থাকা পণ্যগুলো এপ্রিলে শিপমেন্ট হওয়ায় আয়ের অংকটি বড় দেখাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো কারখানাতেই নতুন করে বড় কোনো ক্রয়াদেশ আসেনি বা ক্রেতাদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও একই মত পোষণ করেছেন। তার মতে, হুট করে এক মাসের বড় প্রবৃদ্ধি দেখেই রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলা যাবে না। দীর্ঘ ছুটির পর স্থবির হয়ে থাকা চালানগুলো যখন একসঙ্গে নিষ্পত্তি হয়, তখন এমন চিত্র ফুটে ওঠে। এটি প্রকৃত উন্নতির চেয়ে সাময়িক সমন্বয়ের বহিঃপ্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

চলতি অর্থবছরের ১০ মাসের হিসাবে দেখা যায়, প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে ৩১৭ কোটি ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতের আয়ই আগের চেয়ে কমেছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য (৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি), হোম টেক্সটাইল (৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং পাট ও পাটজাত পণ্য (২ দশমিক ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি) কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। বিশেষ করে প্রকৌশল পণ্য খাতে ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহে আবারও বড় ছুটি থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে সামনের মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও নতুন সরকারের অধীনে ক্রেতাদের আস্থার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে চলতি অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে শেষ হওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পুশ-ইনের নতুন রুট কি ময়মনসিংহ-শেরপুর সীমান্ত?

এপ্রিলে রপ্তানি আয়ে বড় লাফ: টেকসই উন্নতি নাকি সাময়িক উল্লম্ফন?

আপডেট সময় : ০২:১১:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ মে ২০২৬

দেশের রপ্তানি খাতে দীর্ঘ আট মাসের মন্দা কাটিয়ে এপ্রিলে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির দেখা মিলেছে। তবে এই উল্লম্ফন স্থায়ী কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ার কারণে নয়, বরং মার্চ মাসের জমে থাকা শিপমেন্ট বা চালান এপ্রিলে সম্পন্ন হওয়ার একটি গাণিতিক ফলাফল মাত্র।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের রপ্তানি আয় বছরওয়ারি হিসেবে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই মাসে যা ছিল ৩০০ কোটি ডলার। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ওপর ভর করেই এই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার লক্ষ্য করা গেছে। তবে জুলাই-এপ্রিল মেয়াদে সামগ্রিক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কমে ৩৯ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ইপিবি এই প্রবৃদ্ধিকে বৈশ্বিক বাজারের নবোদ্যম এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দাবি করলেও তৈরি পোশাক খাতের মালিকরা ভিন্ন কথা বলছেন। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, মার্চ মাসে ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির কারণে কারখানা বন্ধ থাকায় অনেক পণ্য জাহাজীকরণ করা সম্ভব হয়নি। সেই জমে থাকা পণ্যগুলো এপ্রিলে শিপমেন্ট হওয়ায় আয়ের অংকটি বড় দেখাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো কারখানাতেই নতুন করে বড় কোনো ক্রয়াদেশ আসেনি বা ক্রেতাদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়নি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও একই মত পোষণ করেছেন। তার মতে, হুট করে এক মাসের বড় প্রবৃদ্ধি দেখেই রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে বলা যাবে না। দীর্ঘ ছুটির পর স্থবির হয়ে থাকা চালানগুলো যখন একসঙ্গে নিষ্পত্তি হয়, তখন এমন চিত্র ফুটে ওঠে। এটি প্রকৃত উন্নতির চেয়ে সাময়িক সমন্বয়ের বহিঃপ্রকাশ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

চলতি অর্থবছরের ১০ মাসের হিসাবে দেখা যায়, প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৮২ শতাংশ কমে ৩১৭ কোটি ডলারে নেমেছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার ও ওভেন—উভয় খাতের আয়ই আগের চেয়ে কমেছে। তবে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য (৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি), হোম টেক্সটাইল (৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি) এবং পাট ও পাটজাত পণ্য (২ দশমিক ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি) কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। বিশেষ করে প্রকৌশল পণ্য খাতে ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, মে মাসের শেষ সপ্তাহে আবারও বড় ছুটি থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ফলে সামনের মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধির এই ধারা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হবে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি ও নতুন সরকারের অধীনে ক্রেতাদের আস্থার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে চলতি অর্থবছর নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে শেষ হওয়ার শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।