ঢাকা ০৬:৪৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

নারী-শিশু নির্যাতন মামলা: সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, দীর্ঘসূত্রতায় বিচারহীনতার ঝুঁকি

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারপ্রক্রিয়ার এক হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, আর সাজার হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে। শনিবার ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক এই গবেষণার তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪২টি ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি মামলায় গড়ে অন্তত ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে এবং ১০ শতাংশ মামলা শেষ পর্যন্ত আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বিচারের এই ধীরগতি ও সাজার নিম্ন হারের পেছনে বেশ কিছু গুরুতর কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাক্ষীর অনুপস্থিতি, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা, ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ বিলম্ব এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। এ ছাড়াও তদন্তের নিম্নমান, নিষিদ্ধ ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতির ব্যবহার অব্যাহত থাকা, সামাজিক চাপ এবং আসামিদের প্রভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার অভিযোগকারী দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার চাপে একসময় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচার বিভাগের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন যে, বাজেটের দিক থেকে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় অঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তিনি উল্লেখ করেন, পুরো বিচার বিভাগের বাজেট যেখানে মাত্র ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সেখানে বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানের বাজেটও এর চেয়ে বেশি। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বাজেট বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কেবল আইন নয়, বরং বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ব্যারাকে ফিরছে সেনাবাহিনী: জুনের মধ্যে মাঠপর্যায় থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত

নারী-শিশু নির্যাতন মামলা: সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ, দীর্ঘসূত্রতায় বিচারহীনতার ঝুঁকি

আপডেট সময় : ১১:৩১:০০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারপ্রক্রিয়ার এক হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছেন, আর সাজার হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে। শনিবার ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং তা নিরসনের উপায়’ শীর্ষক এই গবেষণার তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪২টি ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে তিন বছর সাত মাস সময় লাগছে। ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিটি মামলায় গড়ে অন্তত ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে এবং ১০ শতাংশ মামলা শেষ পর্যন্ত আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে, যা প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রাপ্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

বিচারের এই ধীরগতি ও সাজার নিম্ন হারের পেছনে বেশ কিছু গুরুতর কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাক্ষীর অনুপস্থিতি, দুর্বল তদন্ত ব্যবস্থা, ফরেনসিক ও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ বিলম্ব এবং সাক্ষী সুরক্ষার অভাব। এ ছাড়াও তদন্তের নিম্নমান, নিষিদ্ধ ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতির ব্যবহার অব্যাহত থাকা, সামাজিক চাপ এবং আসামিদের প্রভাব বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার অভিযোগকারী দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার চাপে একসময় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দেন।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিচার বিভাগের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন যে, বাজেটের দিক থেকে বিচার বিভাগ রাষ্ট্রীয় অঙ্গগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তিনি উল্লেখ করেন, পুরো বিচার বিভাগের বাজেট যেখানে মাত্র ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা, সেখানে বিটিভির মতো প্রতিষ্ঠানের বাজেটও এর চেয়ে বেশি। বিচার বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বাজেট বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কেবল আইন নয়, বরং বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।