কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে গত তিন দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বোরো ধান চাষিদের স্বপ্ন এখন পানির নিচে। অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনসহ পাঁচটি উপজেলায় প্রায় ৮৪৫ হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে, যদিও কৃষকদের দাবি ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে নদী ভরাট হওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে, যা দ্রুত নিরসন না হলে তলিয়ে যাওয়া ধানে পচন ধরার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নিকলী আবহাওয়া কার্যালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার মাত্র ৬ ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে প্রকৃতির এই তাণ্ডব, অন্যদিকে বজ্রপাতের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে হাওরের কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়েও বড় আঘাত হয়ে এসেছে ধানের বাজারমূল্য। করিমগঞ্জ ও নিকলী উপজেলার কৃষকদের ভাষ্যমতে, এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা, অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ১০০০ টাকার উপরে হওয়ায় এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরিও উঠছে না। হারভেস্টার মেশিনের অতিরিক্ত খরচ এবং বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা বাধ্য হয়ে লোকসানে ধান বিক্রি করছেন। কৃষকদের আক্ষেপ, তাদের থেকে সস্তায় ধান কিনে মিল ও চাতাল মালিকরা ঠিকই চড়া দামে চাল বিক্রি করছেন, যা তাদের নিঃস্ব করে দিচ্ছে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এভাবে লোকসান হতে থাকলে আগামী বছর তারা আর চাষাবাদ করবেন না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং ইতোমধ্যে ৪৮ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। উপপরিচালক সাদিকুর রহমান জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব পেতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে এবং তারা ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রকৃত উৎপাদন খরচের প্রতিবেদন উচ্চমহলে পাঠাবেন। তবে ৩ মে থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার সুফল প্রান্তিক কৃষকরা কতটুকু পাবেন, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সোনালি ধানের ঘ্রাণে যেখানে হাওরে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই লোকসানের হাহাকার আর ‘ফকির’ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে।
রিপোর্টারের নাম 

























