ঢাকা ০১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কী প্রভাব পড়বে?

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েলের তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআর পিএলসি) এখন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গেছে এবং অচিরেই নতুন চালান না এলে বাকি তিনটিও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশে আর কোনো ক্রুড অয়েলের চালান আসেনি।

ফলে বর্তমানে শোধনাগারটি কেবল ‘ডেড স্টক’ বা তলানিতে থাকা তেল দিয়ে নামমাত্র উৎপাদনে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করছে যে, দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে মেটানো হয় বিধায় এটি বন্ধ হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো বিপর্যয় ঘটবে না। সরকারের মতে, চাহিদার সিংহভাগই পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয় এবং বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।

জ্বালানি সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে সরবরাহ বন্ধ না হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারি অকার্যকর হয়ে পড়লে সরকারকে অনেক বেশি দামে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন তেল শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে ডিজেলের উৎপাদনই সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নিজেদের শোধনাগারে তেল পরিশোধন করা আমদানির তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তাই এটি বন্ধ থাকা মানে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নষ্ট হওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। বর্তমানে মজুদ থাকা ১ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম এবং অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা বা স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানো জরুরি যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময়ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

এছাড়া রুশ তেলের মতো বিকল্প উৎসের সুবিধা নিতে কারিগরি পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আমাদের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী হওয়ায় দ্রুত সৌদি আরব থেকে নতুন চালানের জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে বিপিসি। সরকার আগামী মাসে সৌদি আরামকো থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

সংস্কারের ধীরগতিতে আইএমএফের কিস্তি স্থগিত, বাংলাদেশের ঋণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ হলে কী প্রভাব পড়বে?

আপডেট সময় : ১০:৩০:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েলের তীব্র সংকটের কারণে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআর পিএলসি) এখন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিষ্ঠানটির পাঁচটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে ইতোমধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গেছে এবং অচিরেই নতুন চালান না এলে বাকি তিনটিও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশে আর কোনো ক্রুড অয়েলের চালান আসেনি।

ফলে বর্তমানে শোধনাগারটি কেবল ‘ডেড স্টক’ বা তলানিতে থাকা তেল দিয়ে নামমাত্র উৎপাদনে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় দাবি করছে যে, দেশের মোট চাহিদার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে মেটানো হয় বিধায় এটি বন্ধ হলেও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় কোনো বিপর্যয় ঘটবে না। সরকারের মতে, চাহিদার সিংহভাগই পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয় এবং বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেনসহ বিভিন্ন জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।

জ্বালানি সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে সরবরাহ বন্ধ না হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারি অকার্যকর হয়ে পড়লে সরকারকে অনেক বেশি দামে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হবে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে ১৫ লাখ টন তেল শোধন করে ডিজেল, পেট্রোল ও জেট ফুয়েলসহ ১৩ ধরনের জ্বালানি উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে ডিজেলের উৎপাদনই সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, নিজেদের শোধনাগারে তেল পরিশোধন করা আমদানির তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তাই এটি বন্ধ থাকা মানে দেশের উৎপাদন সক্ষমতা নষ্ট হওয়া এবং আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া। বর্তমানে মজুদ থাকা ১ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট দ্রুত স্থাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রকৌশলী মনজারে খোরশেদ আলম এবং অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, দেশের জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সক্ষমতা বা স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানো জরুরি যাতে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার সময়ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।

এছাড়া রুশ তেলের মতো বিকল্প উৎসের সুবিধা নিতে কারিগরি পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন কেউ কেউ। তবে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড আমাদের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী হওয়ায় দ্রুত সৌদি আরব থেকে নতুন চালানের জন্য কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে বিপিসি। সরকার আগামী মাসে সৌদি আরামকো থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।