ঢাকা ০৪:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক: যানজটমুক্ত ঢাকার নতুন স্বপ্ন

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্ন যানজট নিরসনে এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ নামের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ঢাকাকে সম্পূর্ণ সিগন্যালমুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলের উপযোগী একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোর ইন্টারসেকশন বা মোড়গুলোতে আর কোনো লাল-হলুদ-সবুজ বাতির অপেক্ষা থাকবে না, ফলে যানবাহনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।

উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর মোট ১০৫ কিলোমিটার সড়ককে একটি সমন্বিত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার, যার ফলে প্রতিদিন বিপুল কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। বছরে প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় এই আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ১০৫ কিলোমিটার রাস্তায় মোট ৮০টি ইন্টারসেকশন থাকবে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করতে ৪৩টি বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ৬টি অবকাঠামো সচল থাকলেও নতুন করে আরও ৩৭টি অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি ওভারপাস বা আন্ডারপাস, ১৩টি ইউ-লুপ এবং ৭টি ইন্টারচেঞ্জ সার্কেল রয়েছে। এছাড়া পথচারীদের পারাপারের জন্য ৩০টি নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে এবং রিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লোকাল লেনের ব্যবস্থা থাকবে।

পুরো অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই সিস্টেম বাস্তবায়িত হলে আগে যেখানে এক ঘণ্টা সময় লাগতো, সেখানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া আগের স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও আইন অমান্য করার কারণে ব্যর্থ হলেও, অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এবারের ‘জিরো সিগন্যাল’ মডেলটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকার এই মহাপরিকল্পনাকে তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করেছে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনায় ১০৫ কিলোমিটার বাদে বাকি অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোকে অটোমেটেড ট্রাফিক লাইটের আওতায় আনা হবে। মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনায় ৩৭টি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রধান সড়কগুলোকে সিগন্যালমুক্ত করা হবে। আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ঢাকা শহরের অভ্যন্তর থেকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও বাস কাউন্টারগুলো সরিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করা হবে এবং দিনের বেলায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় নিমতলী, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি পয়েন্টে অবকাঠামো নির্মাণের স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই প্রস্তাবনার ওপর তাদের চূড়ান্ত মতামত প্রদান করবে। কার্যকর বাস্তবায়ন ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই জিরো সিগন্যাল পদ্ধতি ঢাকার চিরচেনা যানজট চিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়ে অর্থনীতির চাকা আরও সচল করবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যুতে জামায়াতের গভীর শোক, সতর্কতামূলক পদক্ষেপের দাবি

জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক: যানজটমুক্ত ঢাকার নতুন স্বপ্ন

আপডেট সময় : ০১:১৪:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্ন যানজট নিরসনে এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। ‘জিরো সিগন্যাল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট’ নামের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ঢাকাকে সম্পূর্ণ সিগন্যালমুক্ত ও নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলের উপযোগী একটি আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রকল্পের আওতায় রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কগুলোর ইন্টারসেকশন বা মোড়গুলোতে আর কোনো লাল-হলুদ-সবুজ বাতির অপেক্ষা থাকবে না, ফলে যানবাহনগুলো কোনো বাধা ছাড়াই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।

উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর মোট ১০৫ কিলোমিটার সড়ককে একটি সমন্বিত এক্সপ্রেসওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ কিলোমিটার, যার ফলে প্রতিদিন বিপুল কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। বছরে প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় এই আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার রূপরেখা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ১০৫ কিলোমিটার রাস্তায় মোট ৮০টি ইন্টারসেকশন থাকবে, যেখানে নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচল নিশ্চিত করতে ৪৩টি বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। বর্তমানে মাত্র ৬টি অবকাঠামো সচল থাকলেও নতুন করে আরও ৩৭টি অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি ওভারপাস বা আন্ডারপাস, ১৩টি ইউ-লুপ এবং ৭টি ইন্টারচেঞ্জ সার্কেল রয়েছে। এছাড়া পথচারীদের পারাপারের জন্য ৩০টি নতুন ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে এবং রিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লোকাল লেনের ব্যবস্থা থাকবে।

পুরো অবকাঠামো নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৬৭২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই সিস্টেম বাস্তবায়িত হলে আগে যেখানে এক ঘণ্টা সময় লাগতো, সেখানে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ১৯৯৯ সাল থেকে শুরু হওয়া আগের স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও আইন অমান্য করার কারণে ব্যর্থ হলেও, অবকাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এবারের ‘জিরো সিগন্যাল’ মডেলটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সরকার এই মহাপরিকল্পনাকে তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করেছে। স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনায় ১০৫ কিলোমিটার বাদে বাকি অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোকে অটোমেটেড ট্রাফিক লাইটের আওতায় আনা হবে। মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনায় ৩৭টি নতুন অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রধান সড়কগুলোকে সিগন্যালমুক্ত করা হবে। আর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় ঢাকা শহরের অভ্যন্তর থেকে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও বাস কাউন্টারগুলো সরিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করা হবে এবং দিনের বেলায় ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় নিমতলী, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও উত্তরাসহ গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি পয়েন্টে অবকাঠামো নির্মাণের স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে এই প্রস্তাবনার ওপর তাদের চূড়ান্ত মতামত প্রদান করবে। কার্যকর বাস্তবায়ন ও সঠিক তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এই জিরো সিগন্যাল পদ্ধতি ঢাকার চিরচেনা যানজট চিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়ে অর্থনীতির চাকা আরও সচল করবে।