ঢাকা ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

ডিজেল সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: বিপাকে দেশের কৃষক সমাজ ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি

দেশের কৃষিখাত বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ডিজেল সংকটের মাঝে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা কৃষকদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, পাবনা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০-৩০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েও অনেক জায়গায় ডিজেল মিলছে না। এতে বোরো ধান ছাড়াও আম, শাকসবজি ও পাটের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ পাম্পের পাশাপাশি চাষের পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর এবং ধান মাড়াই মেশিনের ভাড়াও আনুপাতিক হারে বেড়ে যাবে। আমচাষিরা মুকুল বাঁচাতে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছেন না, আবার ধানচাষিরা দুশ্চিন্তায় আছেন যে বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে তাদের চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে। সিলেট বিভাগে প্রতিদিন ৮ লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫-৬ লাখ লিটার। এই জ্বালানি ঘাটতি ও উচ্চমূল্য কৃষকদের চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সহনীয় দাম নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন প্রান্তিক কৃষকরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনের খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার চিরাচরিত ভয় কৃষকদের আরও হতাশ করে তুলছে। ঠাকুরগাঁও ও কুষ্টিয়ার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোতে অনেক কৃষক চাহিদার অর্ধেক তেলও পাচ্ছেন না। যেখানে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য জ্বালানি একটি অপরিহার্য উপাদান, সেখানে এই সরবরাহ সংকট ও আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছে। অনেক এলাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে, যা কৃষিকাজের বিশাল চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এখন কীভাবে এই বাড়তি খরচ মেটানো হবে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন দেশের অন্নদাতারা।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

পশ্চিম তীরে ইসরাইলি আগ্রাসন, অর্ধশতাধিক ফিলিস্তিনি আটক

ডিজেল সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি: বিপাকে দেশের কৃষক সমাজ ও খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি

আপডেট সময় : ০৪:২০:০০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬

দেশের কৃষিখাত বর্তমানে এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ডিজেল সংকটের মাঝে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা কৃষকদের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে বোরো ধানের শীষ বের হওয়ার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, পাবনা ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় কৃষকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এমনকি সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০-৩০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েও অনেক জায়গায় ডিজেল মিলছে না। এতে বোরো ধান ছাড়াও আম, শাকসবজি ও পাটের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেচ পাম্পের পাশাপাশি চাষের পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর এবং ধান মাড়াই মেশিনের ভাড়াও আনুপাতিক হারে বেড়ে যাবে। আমচাষিরা মুকুল বাঁচাতে পর্যাপ্ত পানি দিতে পারছেন না, আবার ধানচাষিরা দুশ্চিন্তায় আছেন যে বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে তাদের চড়া সুদে ঋণ নিতে হতে পারে। সিলেট বিভাগে প্রতিদিন ৮ লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫-৬ লাখ লিটার। এই জ্বালানি ঘাটতি ও উচ্চমূল্য কৃষকদের চাষাবাদের পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দিলেও পর্যাপ্ত সরবরাহ ও সহনীয় দাম নিশ্চিত করা না গেলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন প্রান্তিক কৃষকরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনের খরচ বাড়লেও ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার চিরাচরিত ভয় কৃষকদের আরও হতাশ করে তুলছে। ঠাকুরগাঁও ও কুষ্টিয়ার মতো কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোতে অনেক কৃষক চাহিদার অর্ধেক তেলও পাচ্ছেন না। যেখানে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য জ্বালানি একটি অপরিহার্য উপাদান, সেখানে এই সরবরাহ সংকট ও আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছে। অনেক এলাকায় রেশনিং পদ্ধতিতে তেল দেওয়া হচ্ছে, যা কৃষিকাজের বিশাল চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। এখন কীভাবে এই বাড়তি খরচ মেটানো হবে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন দেশের অন্নদাতারা।