ঢাকা ০৬:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

উৎসব: রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল রসায়ন

উৎসব কেবল আনন্দ বা উদযাপনের মাধ্যম নয়, এর গভীরে প্রোথিত থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দর্শন। রাষ্ট্র ও উৎসবের মধ্যে এক জটিল রসায়ন বিদ্যমান, যেখানে ক্ষমতা তার কোমল বা কঠোর উভয় রূপ ব্যবহার করে কোনো বিষয়কে ‘জাতীয়’ করে তোলে। জাতীয় উৎসবের ধারণা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিকতার জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, যা একক জাতীয়তা ও সংস্কৃতিবোধ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শাসকগোষ্ঠী তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে, প্রশ্নহীন করতে বা সর্বজনীনতার বাতাবরণ তৈরি করতে উৎসবের আশ্রয় নেয়। এমনকি স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেও উৎসব-আয়োজন ও অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই, আর এই স্মৃতিচর্চারও নিজস্ব নীতি ও রাজনীতি রয়েছে।

এ কারণে রাষ্ট্রীয় বা শাসকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত উৎসবে অংশগ্রহণ সর্বদা পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো নির্দোষ ব্যাপার নাও হতে পারে। পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষের হৃদয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও আকুতি থাকে, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি অনেক সময় প্রশ্নসাপেক্ষ। ভাতা ও আদেশের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ এলেও, তাতে প্রায়শই দেখা যায় তড়িঘড়ি ও নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতা। উৎসব পালনের রাষ্ট্রীয় আইনি বাধ্যবাধকতা একে এক ধরনের ‘ধর্মীয় গাম্ভীর্য’ প্রদান করে, যেন উৎসব রাষ্ট্রেরই এক ধরনের ধর্মাচার।

সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম উৎসবকে সামাজিক সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তার ‘collective effervescence’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় মানুষের মধ্যে যে তীব্র আবেগ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়, তা সমাজের বিদ্যমান কাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করে এবং মানুষকে তাদের সামষ্টিক পরিচয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে। ফলে উৎসব এখানে পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখার কাজই বেশি করে। অন্যদিকে, ভিক্টর টার্নার উৎসবকে একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার ‘liminality’ ও ‘communitas’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক ধরনের ‘anti-structure’ ও পবিত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ ক্ষণিকের জন্য হলেও সামাজিক স্তরায়নজনিত অসাম্যকে স্থগিত করে এক ধরনের সাম্যের কৃত্রিম বোধ অনুভব করে। এ কারণেই রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামো উৎসবকে গুরুত্ব দেয় বা উৎসব উৎপাদন ও উদযাপনের আয়োজন করে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুঝুঁকি ও লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ বন্দি বাংলাদেশিরা

উৎসব: রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল রসায়ন

আপডেট সময় : ০২:৩৯:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

উৎসব কেবল আনন্দ বা উদযাপনের মাধ্যম নয়, এর গভীরে প্রোথিত থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং দর্শন। রাষ্ট্র ও উৎসবের মধ্যে এক জটিল রসায়ন বিদ্যমান, যেখানে ক্ষমতা তার কোমল বা কঠোর উভয় রূপ ব্যবহার করে কোনো বিষয়কে ‘জাতীয়’ করে তোলে। জাতীয় উৎসবের ধারণা প্রায়শই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিকতার জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়ায়, যা একক জাতীয়তা ও সংস্কৃতিবোধ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শাসকগোষ্ঠী তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে, প্রশ্নহীন করতে বা সর্বজনীনতার বাতাবরণ তৈরি করতে উৎসবের আশ্রয় নেয়। এমনকি স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেও উৎসব-আয়োজন ও অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই, আর এই স্মৃতিচর্চারও নিজস্ব নীতি ও রাজনীতি রয়েছে।

এ কারণে রাষ্ট্রীয় বা শাসকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত উৎসবে অংশগ্রহণ সর্বদা পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মতো নির্দোষ ব্যাপার নাও হতে পারে। পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষের হৃদয়ে যে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া ও আকুতি থাকে, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি অনেক সময় প্রশ্নসাপেক্ষ। ভাতা ও আদেশের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ এলেও, তাতে প্রায়শই দেখা যায় তড়িঘড়ি ও নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতা। উৎসব পালনের রাষ্ট্রীয় আইনি বাধ্যবাধকতা একে এক ধরনের ‘ধর্মীয় গাম্ভীর্য’ প্রদান করে, যেন উৎসব রাষ্ট্রেরই এক ধরনের ধর্মাচার।

সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম উৎসবকে সামাজিক সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তার ‘collective effervescence’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় মানুষের মধ্যে যে তীব্র আবেগ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়, তা সমাজের বিদ্যমান কাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করে এবং মানুষকে তাদের সামষ্টিক পরিচয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে। ফলে উৎসব এখানে পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখার কাজই বেশি করে। অন্যদিকে, ভিক্টর টার্নার উৎসবকে একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার ‘liminality’ ও ‘communitas’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক ধরনের ‘anti-structure’ ও পবিত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ ক্ষণিকের জন্য হলেও সামাজিক স্তরায়নজনিত অসাম্যকে স্থগিত করে এক ধরনের সাম্যের কৃত্রিম বোধ অনুভব করে। এ কারণেই রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামো উৎসবকে গুরুত্ব দেয় বা উৎসব উৎপাদন ও উদযাপনের আয়োজন করে।