২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ করলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কেন ঐতিহাসিকভাবে টানা দুই মেয়াদ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না, তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে নতুন করে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর এই ভূমিধস বিজয় বিএনপির জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি দলটির দীর্ঘস্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ঐতিহাসিক ব্যর্থতা এক বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি কেবল ভোটের রাজনীতিতে শক্তিশালী হলেও তাদের আদর্শিক স্থবিরতা, সাংস্কৃতিক আধিপত্যের অভাব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব দলটিকে বারবার জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’কে আধুনিক ও বিশ্বায়নমুখী ‘নাগরিক জাতীয়তাবাদে’ রূপান্তর করতে না পারা এবং সুনির্দিষ্ট কোনো শক্তিশালী থিংক ট্যাংক না থাকা দলটির জন্য এক বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলে বিএনপির পিছিয়ে থাকাকে দলটির পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় জাসাস বা শিশু একাডেমির মাধ্যমে যে জাগরণ শুরু হয়েছিল, তা বর্তমানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা ও দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও শিল্পী-সাহিত্যিকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে অনীহার কারণে সমাজে একটি বিশাল বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে দলটি বারবার আমলাতন্ত্র বা বাইরের ‘আউটসোর্সিং’ শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রভাব পড়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত মেরুকরণ বুঝতে ব্যর্থ হওয়ায় দলটি প্রায়শই প্রোঅ্যাকটিভ নীতির বদলে কেবল প্রতিক্রিয়ার রাজনীতিতে আটকে থাকে।
দলের অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক কাঠামো ও তৃণমূল কর্মীদের অবমূল্যায়নকে সবচেয়ে আত্মঘাতী বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যারা রাজপথে শত শত মামলার ঘানি টেনেছেন এবং বছরের পর বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, দল ক্ষমতায় গেলে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে উল্টো উপদেষ্টা বানিয়ে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার এক অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এর বিপরীতে সুবিধাবাদী ও নব্য অনুপ্রবেশকারীদের আধিপত্য দলের স্বাভাবিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে দেয়, যা তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের মধ্যে চরম হতাশা সৃষ্টি করে। এছাড়া একটি টেকসই ও শক্তিশালী মিডিয়া ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে না পারায় ক্ষমতার বাইরে গেলেই বিএনপির রাজনৈতিক আখ্যান বা বয়ান জনগণের কাছে পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই নতুন ম্যান্ডেটকে টেকসই করতে হলে বিএনপিকে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল নির্বাচনী বিজয়ই শেষ কথা নয়; বরং মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন করা এবং গুমের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ নিয়ে তর্কের চেয়ে কাঠামোগত সংস্কারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নীতিনির্ধারণে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সংস্কৃতির ময়দানে উদার বিনিয়োগ এবং রাজপথের পরীক্ষিত কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা ছাড়া ‘এক মেয়াদের অভিশাপ’ থেকে মুক্তি পাওয়া বিএনপির জন্য কঠিন হবে। অন্যথায় বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার পটপরিবর্তনের চক্রে দলটি আবারো পর্যুদস্ত হতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 

























