ঢাকা ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক ‘স্বৈরাচার’ সুহার্তোকে জাতীয় বীর ঘোষণা

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছে বর্তমান সরকার। তবে সুহার্তোর গায়ে স্বৈরাচার তকমা সেঁটে থাকার কারণে সরকারের সিদ্ধান্তে দেশের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার জন্য অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানে প্রতি বছর জাতীয় বীর পুরস্কারটি প্রদান করা হয়। সোমবার (১০ নভেম্বর) রাজধানী জাকার্তায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং সুহার্তোর সাবেক জামাতা প্রাবোও সুবিয়ান্তো, প্রয়াত প্রেসিডেন্টসহ আরও ১০ জনকে এই সম্মাননা প্রদান করেন।

বিগত শতাব্দীর ৬০ থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত সুহার্তোর ‘নিউ অর্ডার’ শাসনামলে ইন্দোনেশিয়ার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল। তবে সে সময় দেশব্যাপী কয়েক লাখ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী হত্যাসহ ভয়াবহ দমনপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।

গত অক্টোবরে দেশটির সামাজিক ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতীয় বীর সম্মাননার জন্য সুহার্তোসহ প্রায় ৫০ জনের নাম জমা দেয়। সোমবার প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সুহার্তোর সন্তানরা পুরস্কার গ্রহণ করেন। সরাসরি সম্প্রচারে বলা হয়, সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৫ সালে জাকার্তায় জাপানি সেনাদের নিরস্ত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তবে সুহার্তোকে জাতীয় বীর ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে নাগরিক সমাজে। গত সপ্তাহে জাকার্তায় শতাধিক মানুষ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমবেত হন, আর অনলাইনে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন এক পিটিশনে। আজও আরেকটি বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্দোনেশিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, সুহার্তোর স্বৈরাচারী শাসনামলের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া এবং ইতিহাস বিকৃত করার এক স্পষ্ট প্রয়াস থেকে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৬৫ সালে সুহার্তো ক্ষমতা দখলের সময় ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক গণহত্যা ঘটে। ওই সময় কমপক্ষে পাঁচ লাখ ব্যক্তিকে কমিউনিস্ট সন্দেহে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। তার তিন দশকের শাসনকাল প্রচার করা হয় নির্যাতন, গুম ও নাগরিক স্বাধীনতার দমনের ইতিহাস হিসেবে।

তবুও ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ভিত্তি নির্মাণে সুহার্তোর ভূমিকা অস্বীকারের জো নেই। কঠোর হাতে শাসন করলেও তার মূল লক্ষ্য ছিল স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন। তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়।

সুহার্তোর তিন দশকে ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি গড়ে সাত শতাংশে পৌঁছে। দেশটির মূল্যস্ফীতি ১৯৬৬ সালে যেখানে ছিল ৬০০ শতাংশ, তার শাসনামলের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া।

‘বাপাক পেম্বাঙ্গুনান’ বা ‘উন্নয়নের জনক’ হিসেবে খ্যাত সুহার্তো ১৯৯৮ সালে আর্থিক সংকটের সময় প্রবল জনবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন। তার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল।

২০০৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুর পর তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ হন। এরপর থেকে তার সমর্থকরা তাকে জাতীয় বীর ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছিলেন, কিন্তু তার নামে বহু অভিযোগের কারণে এতদিন তা সম্ভব হয়নি।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েলের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক ‘স্বৈরাচার’ সুহার্তোকে জাতীয় বীর ঘোষণা

আপডেট সময় : ০৫:২১:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ নভেম্বর ২০২৫

ইন্দোনেশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছে বর্তমান সরকার। তবে সুহার্তোর গায়ে স্বৈরাচার তকমা সেঁটে থাকার কারণে সরকারের সিদ্ধান্তে দেশের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার জন্য অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মানে প্রতি বছর জাতীয় বীর পুরস্কারটি প্রদান করা হয়। সোমবার (১০ নভেম্বর) রাজধানী জাকার্তায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং সুহার্তোর সাবেক জামাতা প্রাবোও সুবিয়ান্তো, প্রয়াত প্রেসিডেন্টসহ আরও ১০ জনকে এই সম্মাননা প্রদান করেন।

বিগত শতাব্দীর ৬০ থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত সুহার্তোর ‘নিউ অর্ডার’ শাসনামলে ইন্দোনেশিয়ার অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছিল। তবে সে সময় দেশব্যাপী কয়েক লাখ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী হত্যাসহ ভয়াবহ দমনপীড়ন চালানোর অভিযোগ রয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে।

গত অক্টোবরে দেশটির সামাজিক ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতীয় বীর সম্মাননার জন্য সুহার্তোসহ প্রায় ৫০ জনের নাম জমা দেয়। সোমবার প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সুহার্তোর সন্তানরা পুরস্কার গ্রহণ করেন। সরাসরি সম্প্রচারে বলা হয়, সুহার্তো ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৫ সালে জাকার্তায় জাপানি সেনাদের নিরস্ত্রীকরণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

তবে সুহার্তোকে জাতীয় বীর ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে নাগরিক সমাজে। গত সপ্তাহে জাকার্তায় শতাধিক মানুষ এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমবেত হন, আর অনলাইনে প্রায় ১৬ হাজার মানুষ স্বাক্ষর করেছেন এক পিটিশনে। আজও আরেকটি বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্দোনেশিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, সুহার্তোর স্বৈরাচারী শাসনামলের অপরাধকে বৈধতা দেওয়া এবং ইতিহাস বিকৃত করার এক স্পষ্ট প্রয়াস থেকে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৬৫ সালে সুহার্তো ক্ষমতা দখলের সময় ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক গণহত্যা ঘটে। ওই সময় কমপক্ষে পাঁচ লাখ ব্যক্তিকে কমিউনিস্ট সন্দেহে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে। তার তিন দশকের শাসনকাল প্রচার করা হয় নির্যাতন, গুম ও নাগরিক স্বাধীনতার দমনের ইতিহাস হিসেবে।

তবুও ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ভিত্তি নির্মাণে সুহার্তোর ভূমিকা অস্বীকারের জো নেই। কঠোর হাতে শাসন করলেও তার মূল লক্ষ্য ছিল স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন। তার সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়।

সুহার্তোর তিন দশকে ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধি গড়ে সাত শতাংশে পৌঁছে। দেশটির মূল্যস্ফীতি ১৯৬৬ সালে যেখানে ছিল ৬০০ শতাংশ, তার শাসনামলের শেষ নাগাদ তা কমে দাঁড়ায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ ইন্দোনেশিয়া।

‘বাপাক পেম্বাঙ্গুনান’ বা ‘উন্নয়নের জনক’ হিসেবে খ্যাত সুহার্তো ১৯৯৮ সালে আর্থিক সংকটের সময় প্রবল জনবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন। তার ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল।

২০০৮ সালে ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুর পর তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ হন। এরপর থেকে তার সমর্থকরা তাকে জাতীয় বীর ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছিলেন, কিন্তু তার নামে বহু অভিযোগের কারণে এতদিন তা সম্ভব হয়নি।